ঈদযাত্রায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বেড়ে গেল কেন

· Prothom Alo

ইশপের সেই বিখ্যাত গল্প আমাদের সবারই জানা। এক গ্রামের পুকুরে বাস করা ব্যাঙদের ওপর খেলার ছলে ঢিল ছুড়ছিল একদল বালক। যখন ব্যাঙরা মরতে শুরু করল, তখন এক বৃদ্ধ ব্যাঙ মাথা তুলে আকুতি জানিয়ে বলেছিল, যা তোমাদের কাছে মজার খেলা, তা আমাদের জন্য মৃত্যুর কারণ। আমাদের দেশে চলন্ত রেলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনাগুলো প্রথম দিকে শিশুদের মজার ছলে করা কাজ মনে হলেও এখন বিষয়টি আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এর পেছনে কোনো রহস্য বা অশুভ কোনো শক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকতে পারে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, এই বিপদে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেই বিজ্ঞ বৃদ্ধ ব্যাঙের মতো কাউকে এখনো দেখা যাচ্ছে না।

Visit sweetbonanza.qpon for more information.

রেলযাত্রায় এই নির্মম পাথরের আঘাতে প্রাণহানি কিংবা পঙ্গুত্বের খবর নতুন নয়। কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সর্বশেষ গত বুধবার (১৮ মার্চ) ঢাকা থেকে রাজশাহী ফিরছিল আন্তনগর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ট্রেনটি যখন পাবনার বড়াল ব্রিজ স্টেশনে প্রবেশের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই বিকট শব্দে জানালার কাচ ভেঙে তিরের মতো এসে বিঁধল যাত্রীদের গায়ে। ওই বগিতে থাকা অন্তত ছয়জন যাত্রী রক্তাক্ত হলেন। তাঁদের মধ্যে রায়ান নামের তিন বছর বয়সী এক শিশুও ছিল। নির্মম এই খেলা থেকে রেহাই পায়নি ওই নিষ্পাপ শিশু।

ট্রেনে ছিলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা হাবিবুল আওয়াল। তাঁর বাড়ি রাজশাহী নগরের শালবাগান এলাকায়। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় তিনি আমার ফোন নম্বরটি ‘প্রথম আলোর সাংবাদিক’ নামে সেভ করে রেখেছিলেন। কিন্তু আমার নাম ভুলে গিয়েছিলেন। ঘটনার ঘণ্টাখানেক পরে কোথাও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে আমার নম্বরে ফোন করেন। এই এক ঘণ্টার মধ্যে যা যা ঘটেছে, তার বর্ণনা শুনে রীতিমতো বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেলাম।

১৩ দিনে ছয়বার কক্সবাজার-ঢাকা পর্যটক ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকাটি বলছে ৪০টির বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫জন আহত হয়েছেন।

রাত নয়টার দিকে হাবিবুল আওয়ালের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা তখন বড়াল ব্রিজ স্টেশন থেকে বাঘা উপজেলার আড়ানী স্টেশনে চলে এসেছেন। তাঁরা সবাই ট্রেনের ‘ঘ’ বগিতে ছিলেন। নানাভাবে তাঁরা রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন। আর বড় সমস্যা ছিল জানালাগুলো ফিক্স করা। ওঠানো বা নামানো কিছুই করতে পারছিলেন না। ওই ঘটনার পর তিনি রেল সহায়তার হটলাইন ১৩১ নম্বরে বারবার ফোন দিয়েছেন, কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও ফোন করেছিলেন। সেখান থেকেও একজন ফোন ধরে বলেন, ‘ট্রেন তো চলছে, বরং ১৩১ নম্বরেই ফোন দেন।’ এরপর তিনি আবার ১৩১ নম্বরে ফোন দেন। তারপরও কেউ ফোন ধরেননি। এরপর তিনি খেয়াল করেন ট্রেনের টিকিটে একটা হটলাইন নম্বর দেওয়া রয়েছে। তিনি সেই নম্বরে চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকে বারবার ফোন কেটে দেওয়া হয়। কোনো উপায় না পেয়ে তাঁরা ট্রেনের ক্যাটারিং সার্ভিসের এক কর্মীকে রেলওয়ে পুলিশ ও গার্ডকে (পরিচালক) বিষয়টি জানানোর অনুরোধ করেন। প্রায় ২০ মিনিট পর রেলওয়ে পুলিশের এক সদস্য আসেন। তিনি আরেকজনের ওপর দায়িত্ব দিয়ে চলে যান।

এতটুকু শোনার পরে আমি সিল্কসিটি ট্রেনের গার্ডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকি। একজন স্টেশনমাস্টারকে ফোন করলাম গার্ডের নম্বরের জন্য। তিনি বললেন, ‘পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে আমি বদলি হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলে এসেছি।’

ফোন খুঁজতে খুঁজতে মামুন নামের একজন গার্ডের নম্বর পেলাম। তিনি বললেন, তিনি তো আজ ওই ট্রেনে নেই। অন্য গার্ডের নম্বরও নেই। তবে তিনি আজাদ নামের এক স্টেশনমাস্টারের ফোন নম্বর দিলেন। তাঁকে ফোন করা হলে তিনি মশিউর রহমান নামের একজন গার্ডের নম্বর দেন। রাত সোয়া ১০টায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। 

তিনি বলেন, ট্রেন ইতিমধ্যেই রাজশাহী স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। এই ট্রেনের পাথর নিক্ষেপের ঘটনা তাঁকে কেউ অবহিত করেননি। এবার তাঁকে অনুরোধ করলাম ‘ঘ’ বগির জানালার কাঁচ ভাঙা হয়েছে—বিষয়টি দেখে নিশ্চিত করতে পারেন কি না। জবাবে তিনি বললেন, ডিউটি করে চলে এসেছেন, বলতে পারবেন না।

এরপর দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশনমাস্টার আজাদকে পুনরায় ফোন দেওয়া হলে তিনিও বলেন তিনিও স্টেশন থেকে চলে এসেছেন, জানাতে পারবেন না। তবে তিনি তাঁর পরের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশনমাস্টার আবদুল মালেকের নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি জিআরপির সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিলেন। এরপর আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার এনার্জি পেলাম না।

সরেজমিনে ট্রেনের বগিটি দেখার জন্য প্রথম আলোর রাজশাহীর আলোকচিত্রী শহিদুল ইসলামকে পাঠানো হলো। ততক্ষণে ট্রেনটি ওয়াচপিটে চলে গেছে। তিনি সেখানে গিয়ে জানালেন, পাথরের আঘাতে ট্রেনের চারটি জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে। ততক্ষণে রাত ১০টা ৫৮ মিনিট বেজে গেছে। এতক্ষণে মনে একটা নতুন প্রশ্নের উদয় হলো, ‘এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও কি দায়ী নয়?’

বৃহস্পতিবার পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপককে ফোন করলাম বিষয়টি জানেন কি না। তিনি বললেন, নিউজ দেখেছি। অভিযোগ শুনে বললেন, সবাই বগুড়ার ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ওই দিকে মনঃসংযোগ দিতে পারেননি। পশ্চিম রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ফোন না ধরার কারণে বছরে ট্রেনে পাথর হামলা পরিসংখ্যান পাওয়া গেল না।

হারিয়ে যাওয়া সেই আজিমপুর কলোনি

তবে গত ১৪ মার্চ চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় দৈনিকের খবর অনুযায়ী, ১৩ দিনে ছয়বার কক্সবাজার-ঢাকা রেললাইনে পর্যটক ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকাটি বলছে, ৪০টির বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। ৩ মার্চের হামলার ঘটনাকে ডাকাতির চেষ্টা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। চলতি মাসে এসব হামলার ব্যাপারে যাত্রী বা রেলকর্তৃপক্ষের কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। তাতে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২২ সালের ৩ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে ঈদের ছুটি শেষে চট্টগ্রাম থেকে ফেরার ট্রেনে ছিলেন প্রকৌশলী প্রীতি দাশ (২৪); বিয়ে হয়েছে মাত্র ১৭ মাস। ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছুড়ে মারা পাথরের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে খুলনার বেনাপোল রোডে কমিউটার ট্রেনে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে ট্রেনের পরিদর্শক বায়েজিদ মারাত্মকভাবে আঘাত পান। ৪১ দিন পর মৃত্যু হয়।

সৈয়দপুরে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে এক ছোট শিশুর চোখ নষ্ট হয়ে যায়। কেউ এর প্রতিকার পেয়েছেন বলে জানা নেই। নিরাপদ, আরামদায়ক রেলভ্রমণকে যারা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কেউ নেই—তা তো নয়, আইন আছে। আইনের প্রয়োগকারী হয়তো ঘুমিয়ে আছেন। তবে আপনাদেরও ঘুম ভাঙতে পারে।

২০১৯ সালে জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বগিতেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। তিনি সৌভাগ্যক্রমে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। সবার তো এমন সৌভাগ্য না–ও হতে পারে। তিনি ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু সবাই যে এমন সৌভাগ্য নিয়ে ফিরবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিরাপদ ভ্রমণের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ট্রেনযাত্রাকে যারা দিন দিন অনিরাপদ করে তুলছে, তাদের ঘুম ভাঙানো জরুরি। নইলে সাধারণ যাত্রীদের ঈদ বা দৈনন্দিন যাত্রা কেবল আতঙ্কের অন্য নাম হয়েই টিকে থাকবে।

আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিবেদক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source