নেটফ্লিক্সের সাফল্যের পেছনের গল্প, শুনুন অন্যতম সিইও গ্রেগ পিটার্সের মুখে
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের আমন্ত্রণে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির হয়েছিলেন গ্রেগ পিটার্স। নেটফ্লিক্সের তিনি সহ–প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে নিজেদের ব্যবসার ধরন বদলে ফেলেছে নেটফ্লিক্স, সেই গল্পই শুনিয়েছেন তিনি। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে আমি পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছি। মার্কিন বিমানবাহিনীর আরওটিসি (রিজার্ভ অফিসার্স ট্রেইনিং কর্পস) বৃত্তি পেয়েছিলাম। তাই পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরও আমাকে তাঁদের সঙ্গে আরও পাঁচ বছর কাজ করতে হয়েছে। সে সময় দুটি বড় প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলাম। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ও স্যাটেলাইট পরিচালনা।
Visit zeppelin.cool for more information.
তারপর এক বছর বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট খাতে কাজ করি, সংক্ষেপে যাকে বলে কমস্যাট। আমার জন্য এটাই ছিল বেসরকারি খাতে পা রাখার প্রস্তুতি। তখন আমার সবচেয়ে বড় দক্ষতা ছিল সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট। ডট-কম যুগ সে সময় কেবল শুরু হচ্ছে, তাই আমি কয়েকটি স্টার্টআপ দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। সত্যি বলতে আমার সব কটি স্টার্টআপের গল্পই প্রায় এক। আইডিয়া খারাপ ছিল না। কিন্তু সম্ভবত সময়ের চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর আগেই শুরু করতে চেয়েছিলাম।
‘ছেলেই আমার ডিপিএস’, বললেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া শামীমের বাবাএরপর একদিন নেটফ্লিক্স থেকে ফোন এল। তারা বলল, ‘যে কাজটা তুমি তোমার শেষ স্টার্টআপে করতে চেয়েছিলে, আমরা এখন ঠিক সেটাই করছি। তুমি কি আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে?’ মনে করিয়ে দিই, তখন নেটফ্লিক্স কেবল ডাকযোগে ডিভিডি পাঠাত। লাল খামের ভেতরে। এটাই ছিল কনটেন্ট বিতরণের পদ্ধতি।
এরপর ১৭-১৮ বছর কেটে গেছে। বিস্ময়করভাবে, এখনো আমি নেটফ্লিক্সেই আছি। ডিভিডির যুগে আমরা নিজেদের সফল মনে করতাম। অবশ্য সফলতা একটা আপেক্ষিক বিষয়। কিন্তু তখন আমরা ব্লকবাস্টারকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। ব্লকবাস্টার সে সময় ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া দিত। আমরা যখন তাদের হারালাম, সেটাকে বিশাল সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু এমন সাফল্যের পর একটা সমস্যা তৈরি হয়। সাফল্য রক্ষা করার দিকে মানুষ এত মনোযোগী হয়ে যায় যে ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। এর সঙ্গে ধীরে ধীরে কিছুটা আত্মতুষ্টি আর অহংকারও তৈরি হয়।
তাই আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিই। ঠিক করি, আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবসা ভেঙে নতুন করে ঢেলে সাজাব। অন্য কেউ এসে আমাদের ব্যবসা বদলে দেবে, সেই ঝুঁকি নেব কেন! এর চেয়ে বরং আমরাই করি। তখনই বুঝতে পারছিলাম, ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্ট্রিমিং ও ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশনই (বিতরণ) ভবিষ্যৎ। তাই একটা নীতি ঠিক করি। স্ট্রিমিং নিয়ে যে কাজই করব, সেটা যদি আমাদের ডিভিডি ব্যবসাকে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তাহলে বুঝে নেব আমরা যথেষ্ট সাহসীভাবে এগোচ্ছি না। কারণ, যদি আমরা না করি, তার মানে নিশ্চয়ই অন্য কেউ করছে; বিশেষ করে এমন কেউ, যার হারানোর মতো কিছু নেই।
একসময় যখন দেখলাম স্ট্রিমিং সত্যিই দ্রুত এগোচ্ছে, তখন আরও একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিই। ডিভিডি বিভাগের লোকদের ডেকে বলি, এখন থেকে তোমরা ম্যানেজমেন্টের মিটিংয়ে অংশ নেবে না। আলাদা হয়ে কাজ করবে। কোম্পানির ভেতরে এটা ছিল বেশ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। কারণ, এই লোকেরাই এত দিন কোম্পানির মূল ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে, তারাই ছিল প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী নেতৃত্ব।
তবু আমরা সেই পরিবর্তনটা এনেছিলাম। ডিভিডি ব্যবসা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা স্ট্রিমিংয়ে নিয়ে এসেছিলাম। যেমন আমাদের রেকমেন্ডেশন সিস্টেম (মানুষ কোন সিনেমা বা সিরিজ দেখতে পারে, সেটার পরামর্শ)। ওয়েবসাইট টিমকেও আমরা নতুন কাজে নিয়ে আসি। মোটামুটি ৬০ শতাংশ মানুষ তখন নতুন স্ট্রিমিং ব্যবসায় যুক্ত হয়।
অনেকে মিলে কিছু অর্জনের আনন্দও অনেক: মাহবুব মজুমদারকিন্তু বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ, যারা এত দিন কোম্পানির মূল ব্যবসা গড়ে তুলেছিল, তাদের জন্য বিষয়টা ছিল খুব কঠিন। যেন তাদের বলা হচ্ছিল, ‘এখন তোমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।’ এটা ছিল খুব কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনাকে বুঝতে হবে, আপনি আসলে কোন জায়গায় প্রতিযোগিতা করছেন এবং পুরো ভ্যালু চেইনের কোন অংশে আপনার দীর্ঘমেয়াদি শক্তি আছে।
উদাহরণ দিই। আমি মনে করি না যে এআই মডেল তৈরি করা আমাদের কোম্পানির জন্য জরুরি কোনো বিষয়। পৃথিবীর অনেক প্রতিষ্ঠান এ কাজে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। সম্ভবত শিগগিরই এটা ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে যাবে। অতএব সে পথে আমাদের যাওয়ার দরকার নেই। কারণ, আমরা চাইলে বাণিজ্যিক মডেল বা ওপেন সোর্স মডেল ব্যবহার করে সেই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারি। আমাদের শক্তি অন্য জায়গায়। প্রচুর দর্শক আমাদের কনটেন্ট দেখেন, বিশাল একটা ডিস্ট্রিবিউশন (বিতরণ) পদ্ধতি আমাদের আছে, আমরা বড় পরিসরে কনটেন্ট তৈরি করতে পারি।
তাই আমাদের কাজ হওয়া উচিত প্রযুক্তিকে দ্রুত ও পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা। মূল প্রযুক্তিগুলোকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে, তার সঙ্গে আমরা কী কী বিশেষ জিনিস যোগ করতে পারি, তা খুঁজে বের করা। এটাই আমাদের ভূমিকা হওয়া উচিত। নিজেদেরই নিজেদের বদলে ফেলতে হবে, যেন অন্য কেউ এসে সেই সুযোগ না পায়।
আমি মনে করি, এআই বা জেনারেটিভ টুল দিয়ে কনটেন্ট বানানো কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়, হওয়া উচিতও নয়; বরং আমাদের কাজ হলো, যেসব টুল হাতে আছে, সেগুলো দিয়ে কীভাবে দারুণ কিছু তৈরি করা যায়, তা ভাবা। অবশ্যই যদি কেউ শুধু টুলের ওপর নির্ভর করে, শেখার প্রক্রিয়াটা এড়িয়ে যায়, সেটা খারাপ। কিন্তু টুল ব্যবহার করতে চাইলে করা উচিত।
কোম্পানির দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা চাই আমাদের কর্মীরা এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করুক। আর আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এখন পর্যন্ত আমি যা দেখেছি, তাতে এআই নিজে থেকেই নতুন সৃষ্টি বা উদ্ভাবনের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠছে, এমন কোনো আশঙ্কা নেই। এখনো সবকিছুর কেন্দ্রে মানুষই আছে। এআই মানুষের কাজকে আরও দ্রুত, কার্যকর ও শক্তিশালী করে তুলছে। ফলে মানুষ আরও বেশি কিছু তৈরি করতে পারবে। তবু আমি মনে করি, কেন্দ্রে মানুষই থাকবে। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের নীতি খুব সহজ। দেখিই না, এই টুলগুলো কীভাবে ব্যবহার করা যায়; এআই টুলের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়।
ইংরেজি থেকে অনূদিত