বরকত ও বৈচিত্র্যে সুবাসিত শামের রমজান

· Prothom Alo

সিরীয়দের কাছে রমজান হলো বরকতের মাস। দামেস্কের সরু গলি থেকে শুরু করে উত্তর সিরিয়ার প্রান্তিক জনপদ—সবখানেই এই মাসের আলাদা এক সুবাস পাওয়া যায়। ইসলামের ইতিহাসে এই ভূখণ্ড ‘শাম’ নামে পরিচিত।

যদিও সময় এখন প্রতিকূল, তবুও সিরীয় সংস্কৃতিতে রমজানের জৌলুস আজও টিকে আছে তাদের দস্তরখানে, আতিথেয়তায় এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার চিরায়ত অভ্যাসে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

পাতে পাতে বৈচিত্র্য 

সিরিয়ার ইফতারের টেবিলকে বলা হয় ‘সুফরা’। একটি আদর্শ সিরীয় ইফতারে খাবারের বৈচিত্র্য চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। ইফতার শুরু হয় মূলত খেজুর এবং এক বাটি ‘শোরবা’ বা স্যুপ দিয়ে।

এরপর আসে সিরিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সালাদ ‘ফাত্তুশ’। ভাজা রুটির কুচি, পুদিনা পাতা, সুমাক মশলা আর ডালিমের রস দিয়ে তৈরি এই সালাদ ছাড়া সিরীয়দের ইফতার যেন অসম্পূর্ণ।

প্রধান খাবারের মধ্যে থাকে ‘কিববেহ’—যা মাংস এবং গুঁড়ো গম (বুরগুল) দিয়ে তৈরি এক বিশেষ পদ। এছাড়া আছে ‘মাহশি’, যা মূলত আঙুর পাতা বা বাঁধাকপির ভেতরে চাল ও মাংসের পুর দিয়ে তৈরি করা হয়। 

সিরীয়দের প্রিয় আরেকটি পদ হলো ‘ফাত্তাহ’। দই, সেদ্ধ ছোলা এবং মুচমুচে রুটির সংমিশ্রণে তৈরি এই খাবারটি যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিকর।

সিরিয়ানদের ইফতারের টেবিল‘বিপ্লব চত্বরে’ হাজারো প্রাণের মিলনমেলা

তৃষ্ণা মেটাতে ঐতিহ্যবাহী পানীয়

সিরিয়ার ইফতার সংস্কৃতির অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পানীয়। রাস্তায় রাস্তায় রঙিন পোশাক পরে ‘তামার হিন্দি’ (তেঁতুলের শরবত) বিক্রেতাদের দেখা যায়। পিঠে পেতলের বিশাল পাত্র নিয়ে তারা শৈল্পিক ভঙ্গিতে গ্লাসে শরবত ঢেলে দেন

এছাড়া আছে ‘কামার আল-দিন’—এটি মূলত রোদে শুকানো এপ্রিকটের মণ্ড থেকে তৈরি এক ঘন ও মিষ্টি পানীয়। এই পানীয়টি সিরীয়দের কাছে রমজানের সমার্থক।

মিষ্টিমুখ ও ‘সাকবেহ’ সংস্কৃতি

ইফতার পরবর্তী সময়ে সিরীয়রা মিষ্টি জাতীয় খাবার বা ‘হালুয়ায়’ মজে থাকেন। ‘কাতায়েফ’ (এক ধরনের মিষ্টি পিঠা), ‘বাকালাভা’ এবং ‘বারাজেক’ বিস্কুট সিরীয় সংস্কৃতির গর্ব।

তবে এই মিষ্টির চেয়েও সুন্দর হলো তাদের ‘সাকবেহ’ সংস্কৃতি। এটি হলো ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে নিজের তৈরি করা খাবারের একটি অংশ প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া।

এই বিনিময়ের ফলে দেখা যায়, প্রত্যেকের দস্তরখানে নিজের তৈরি খাবারের চেয়ে প্রতিবেশীদের থেকে আসা খাবারের পরিমাণই বেশি থাকে। এটি সিরীয় সমাজের সংহতি ও সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ।

সিরীয়রা স্বভাবগতভাবেই আতিথেয়তা প্রিয়সাহারা মরুর বুকে কোরআনের সুর আর ঐতিহ্যের সুবাস

আতিথেয়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

সিরীয়রা স্বভাবগতভাবেই আতিথেয়তা প্রিয়। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদের এই গুণটি ম্লান হয়নি।

জর্ডান বা লেবাননের শরণার্থী শিবিরে থাকা সিরীয়রা যেমন স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের খাবারের সংস্কৃতি ভাগ করে নিচ্ছেন, তেমনি দেশের ভেতরেও দেখা যায় ধ্বংসস্তূপের ওপর সুন্দর গালিচা বিছিয়ে প্রতিবেশী সবাই মিলে একসঙ্গে বসে ইফতার করছেন।

তাদের কাছে রমজান হলো সবাইকে আগলে রাখার মাস।

শেষ রাতের সাহ্‌রি

সিরিয়ার সাহ্‌রিতে থাকে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার। এর মধ্যে ‘লাবনেহ’ (ছেঁকা দই), জাইতুন বা জলপাই, বিভিন্ন ধরনের পনির এবং সিরিয়ার বিখ্যাত ‘মাকদুস’ (তেলে ভেজানো বেগুনের আচার) জনপ্রিয়।

সাহ্‌রির সময় আজও অনেক এলাকায় ‘মুসাহারাতি’ বা ঢোল বাজিয়ে মানুষকে জাগিয়ে তোলার ঐতিহ্য টিকে আছে।

দামেস্কের প্রাচীন উমাইয়াদ মসজিদের আঙিনায় যখন শত শত মানুষ একসঙ্গে ইফতারের অপেক্ষায় বসে থাকে, তখন মনে হয়—সিরিয়া মানেই এক অমলিন সভ্যতা, যা শত কষ্টের মাঝেও উৎসবের আনন্দ খুঁজে নিতে জানে।

বসফরাসের তীরে আশি হাজারি দস্তরখান

Read full story at source