৮-০ গোলে জেতার পরও বরখাস্ত কোচ

· Prothom Alo

একজন কোচকে কখন বরখাস্ত করা হয়? যখন দিনের পর দিন বাজে পারফর্ম করেন, খেলোয়াড়দের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়, কোচ আর নিজের মতো দলকে সামলাতে পারেন না। কোচকে বরখাস্ত করার হাজারও কারণ থাকতে পারে। তবে একটা জিনিস সত্য—দল ভালো খেললে কোনো কোচই বরখাস্ত হন না। কিন্তু সেই ঘটনাই ঘটিয়ে দেখিয়েছে ফ্ল্যামেঙ্গো। ব্রাজিলিয়ান দলটি তাদের সফল কোচ ফিলিপে লুইসকে বরখাস্ত করেছে ৮ গোলে জেতার পর।

খেলোয়াড় হিসেবে ফিলিপে লুইস খেলেছেন পুরো দুনিয়ার বাঘা বাঘা কোচের অধীনে। ডিয়েগো সিমিওনে থেকে শুরু করে হোসে মোরিনহো। কিন্তু তাঁর জীবনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো কথা বলেছিলেন স্প্যানিশ কোচ লুইস আরাগোনেস। স্প্যানিশ ম্যানেজারের দর্শন ছিল একটাই—‘জিততে হবে’। তাঁর কোনো ধরাবাঁধা দর্শন ছিল না, খেলার ধরনে আবদ্ধ ছিলেন না। অভিজ্ঞ এই কোচের কথা ছিল একটাই—মাঠে নেমেছি মানে জিততে হবে। সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ফিলিপে লুইস নিজেকে গড়েছেনও সেভাবে। বাঁধাধরা ছকে নয়, কোনো বিশাল ফুটবল–দর্শনে নয়। নিজেকে বেঁধেছেন স্রেফ একটি লাইনে—জিততে হবে। এই একটি লাইন দিয়ে ফ্ল্যামেঙ্গো অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, কোচ হিসেবে মাত্র ৪০ বছর বয়সেই ফিলিপে লুইস কাঁপিয়ে দিয়েছেন ফুটবল–দুনিয়াকে। বহুদিন ধরে ফুটবল–দুনিয়ায় ব্রাজিলিয়ান কোচদের অভাব পূরণের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তিনি।

ব্রাজিলিয়ান লিগে কোচদের জন্য লড়াইটা সব সময়ই ভিন্ন। এখানে যতটা না কৌশলের খেলা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় টিকে থাকার লড়াই। এক মৌসুমে দু–তিনবার কোচ বদলানো রীতিমতো স্বাভাবিক ব্যাপার। ফ্ল্যামেঙ্গোও একসময় সেই পথেই ছিল। ফিলিপে লুইস আসার আগে দুই বছরে তারা কোচ পাল্টেছিল চারবার। ফ্ল্যামেঙ্গোতে নিজের ছয় বছরের ক্যারিয়ারে লুইস কোচ পেয়েছিলেন ১০ জন। এর মধ্যে ছিলেন হোর্হে সাম্পাওলি, তিতে, হোর্হে হেসুসের মতো অভিজ্ঞ কোচ। কিন্তু তাঁরাও এই ডামাডোলে টিকতে পারেননি বেশি দিন। সে জায়গায় লুইস টিকে আছেন এক বছরেরও বেশি সময়। কারণ, লুইস জিতছেন।

আর্সেনাল কি আবারও লিগ ফসকাতে চলেছে?ডিয়েগো সিমিওনের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি।

অবসর নেওয়ার অনেক আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন, কোচ হিসেবে ক্যারিয়ার গড়বেন। তাই ফ্ল্যামেঙ্গোতে যোগ দেওয়ার পরই নিয়েছিলেন কোচিং লাইসেন্স। অবসরের এক মাস পরই তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলের দায়িত্ব। সেখান থেকে অনূর্ধ্ব-২০ দলের ভার দেওয়া হয় তাঁর কাঁধে। দায়িত্ব নিতে না নিতেই দলকে নিয়ে জিতে নেন প্রথম শিরোপা। জানুয়ারিতে কোচিং লাইসেন্স পাওয়া ফিলিপে লুইসের হাতে ফ্ল্যামেঙ্গোর দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় অক্টোবরে। সেটাও প্রাক্তন কোচ তিতেকে সরিয়ে।

এরপরই যেন শুরু হলো দলকে নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা। সাত মাস আগে অবসর নেওয়া ফিলিপে লুইস দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে চিনতেন নিজের বন্ধুর মতো। তাঁর দর্শন ছিল এক লাইনের, কিন্তু মাঠে ছিল ভিন্নতা। ফ্ল্যামেঙ্গো আজীবন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে, প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে, সেই ধারা থেকে বের হননি। বরং সেখানে ফোকাস করে দলকে করেছেন শাণিত। হাই প্রেস, আর্জেন্সি, দুই–একটা পজিশনে অদলবদল আর যুবদল থেকে নিজের দুই বিশ্বস্ত সেনানী বারবোসা ও ওয়েসলিকে দলে টেনে আনা। ব্যস, বদলে গেল ফ্ল্যামেঙ্গোর হালচাল।

ফিলিপে লুইসের সবচেয়ে বড় নজর ছিল ছোট ছোট বিষয়ে। দলের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় তিনি লক্ষ্য রাখতেন। সহকারী কোচ, স্পোর্টিং ডিরেক্টরেরা অবাক হয়েছেন তাঁর কর্মকাণ্ড দেখে। সাধারণত ব্রাজিলিয়ান কোচরা এদিক থেকে বেশ উদাসীন হন। দলের ভেতরে প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক খুব একটা থাকে না। নিজেকেই সর্বেসর্বা ভাবেন। কিন্তু ফিলিপে তেমন নন। বরং প্রতিমুহূর্তে তিনি শিখছেন, খেলোয়াড়েরা তার ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি তা শুধরে নিচ্ছেন, নিজেকে প্রস্তুত করছেন ভবিষ্যতের জন্য। ফলে খেলোয়াড়েরা যেমন তার অধীনে মন খুলে খেলতে পারছেন, তিনিও দলের সঙ্গে মিশে যেতে পারছেন। ইউরোপিয়ান ফুটবলে কোচরা যেমন খেলোয়াড়দের বন্ধু হয়ে থাকে, ফিলিপে লুইস সেটাই তৈরি করছেন ব্রাজিলে এসে। যার ফলাফল মিলেছে মাঠে।

টটেনহাম কি সত্যিই অবনমিত হয়ে যাচ্ছেকোপা লিবার্তোদোরেস জেতার পর ফিলিপে লুইস।

জানুয়ারি থেকে এপ্রিল—টানা ১৬ ম্যাচ অপরাজিত ছিলেন ফিলিপে লুইস। আশির দশকের দুর্দান্ত ফ্ল্যামেঙ্গো দলের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছিল তার ফুটবল। দরিভাল জুনিয়রের বিদায়ের পর তাঁকে অনেকে ভেবেছিলেন ব্রাজিলের কোচ হিসেবে। কিন্তু এখনই এত বড় দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলেন না ফিলিপে। কারণ, চড়াই হয়েছে, উতরাই এখনো বাকি। কোপা লিবার্তোদোরেসেই দেখা মিলল সেই উতরাই। টানা দুই ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ যাওয়ার দশা। সব নিয়ে আবারও বসলেন কোচ, বের করলেন সমস্যা। প্রতিটি খেলোয়াড়কে উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর পরের দুই ম্যাচ জিতে পরবর্তী পর্ব নিশ্চিত করল ফ্ল্যামেঙ্গো।

ক্লাব বিশ্বকাপে পুরো বিশ্ব দেখল ফিলিপে লুইসের কেরামতি। চেলসিকে হারিয়ে গ্রুপ পর্বের শীর্ষে থেকে পরবর্তী পর্বে পা দিয়েছিল ফ্ল্যামেঙ্গো। তারপর ইন্টার মিলান, আল হিলালকে হারিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সেমিতে। কিন্তু চেলসির কাছে সেমির বাধা পেরোতে পারেননি ফিলিপে লুইস। কিন্তু সবাই বুঝেছিল লুইস নতুন কিছু নিয়ে আসছেন। সেটার ফলাফল মিলল পাঁচ মাস পর, কোপা লিবার্তোদোরেসের ফাইনালে।

কোয়ার্টার আর সেমিতে হারিয়েছেন আর্জেন্টিনার এস্তুদিয়ান্তেস ও রেসিং ক্লাবকে। আর ফাইনালে নিজেদের প্রতিপক্ষ পালমেইরাস। তাদেরকে ১-০ গোলে হারিয়ে জিতে নিয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নস লিগ। খেলোয়াড়ি জীবনে দুবার জিতেছেন কোপা লিবার্তোদোরেস, কোচিং জীবনেও সেই কোটা পূরণ হয়ে গেল। গত মৌসুমে জিতেছেন কোপা দো ব্রাজিল, আছেন লিগের শীর্ষে। জিতেছেন লিগও। লুইস যখন নিজেকে প্রমাণ করে যাচ্ছেন, তখনই তাঁকে বরখাস্ত করেছে ফ্লামেঙ্গো।

টটেনহাম কি সত্যিই অবনমিত হয়ে যাচ্ছে

এর কারণ হিসেবে অবশ্য ফ্লামেঙ্গো কিছু বলেনি এখনো। তবে ধারণা করা হচ্ছে, মৌসুমের শুরুতেই ডমেস্টিক সুপার কাপ ও সাউথ আমেরিকান সুপার কাপের শিরোপা জিততে না পারায় তাঁকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আরেকটা গুঞ্জনও আছে বাজারে। ফিলিপে লুইস ফ্লামেঙ্গোকে না জানিয়েই চেলসি মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে একটা গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। একে তো কোচ অন্য দলে যেতে চাইছেন, সঙ্গে বেতনও বাড়ছে। সব মিলিয়ে ক্লাব থেকে সিদ্ধান্ত এল তাঁকে ছেঁটে ফেলার। বলা বাহুল্য শেষ ম্যাচের আগেই তাঁকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত চলে এসেছিল। ফলে ৮ গোল কেন, ২০ গোলে জিতলেও তাঁকে বরখাস্তই করা হতো।

কোচের জীবন, বরখাস্ত তো হবেনই। এখন লুইস নিচ্ছেন সামান্য অবসর। কারণ, সামনেই ইউরোপের বাঘা বাঘা দল তার পেছনে ছুটবে টাকার বস্তা নিয়ে। ব্রাজিল থেকে এমনিতেই কোচ উঠে আসে কম। সেখানে তাঁর কৌশল চমক তৈরি পারে পুরো ইউরোপে। দেখা যাক ভবিষ্যতে কী লেখা আছে তাঁর জন্য!

পাঁচ বছর ধরে জেতেন না ট্রফি, তবু সিমিওনে কেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোচ?

Read full story at source