মেয়েদের হল থেকেই যাত্রা শুরু করছে নানা উদ্যোগ
· Prothom Alo
মধ্যরাত। অন্যরা যখন ঘুমাচ্ছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের একটি রুমে তখন চলছে শাড়ি প্যাকেট করার কাজ। ঘরময় ছড়িয়ে আছে শাড়ি, টেপ, কাঁচি, বাক্স...।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কবি সুফিয়া কামাল হলের আরেক রুমে রাত জেগে আঁকাআঁকি করছেন একজন। টোটব্যাগ, চুড়ি বা ক্লে দিয়ে বানানো বিভিন্ন সামগ্রীতে চলছে রঙের খেলা।
তাসলিমা মিশু ও মাহিয়া বিনতে মাহমুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এমনই দুটি দৃশ্য চোখে ভাসল। হলে থাকাকালেই উদ্যোক্তা হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই শিক্ষার্থী। অনলাইনে ‘তাঁতুয়ার বোনা জামদানি–রিভাইভিং রয়্যাল থ্রেডস’ নামে পাওয়া যাবে তাসলিমা মিশুর পণ্য। অন্যদিকে মাহিয়ার উদ্যোগটির নাম ‘হিয়া–Hiya’।
২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু, এখন ভাড়া আর বেতন বাবদই দেন ১৪ লাখ টাকার বেশিদেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন ক্যাম্পাসের ছাত্রী হলগুলোয় যদি ঢুঁ মারেন, তাহলে এমন অনেক উদ্যোক্তার দেখাই আপনি পেয়ে যাবেন। কেউ হয়তো নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করছেন পণ্য। কেউ আবার নানা জায়গা থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করছেন অনলাইনে। ঈদ সামনে রেখে এই উদ্যোক্তাদের কাজের চাপ আরও বেড়েছে। পরদিনই হয়তো সকালে ক্লাস আছে, কিন্তু কাজ ফেলে রাখার সুযোগ নেই। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই গ্রাহকের হাতে পণ্য পৌঁছাতে হবে।
হল থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করার অভিজ্ঞতা কেমন? জানতে কয়েকজন নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম আমরা।
সালামি যখন পুঁজি
বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর অনেক শিক্ষার্থী চান, নিজের খরচ নিজেই জোগাবেন। কিন্তু আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পড়াশোনা চলাকালে কাজ পাওয়া বেশ কঠিন। মেয়েদের জন্য চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি। তবে অনলাইননির্ভর ব্যবসায়িক উদ্যোগ অনেক ছাত্রীকেই নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে পড়েন মাহিয়া বিনতে মাহমুদ। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ। অনার্সের ষষ্ঠ সেমিস্টারে ‘এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ কোর্স করতে গিয়ে মাথায় আসে, আগ্রহটিকে উদ্যোগে রূপ দিলে কেমন হয়! মাহিয়া মনে মনে ঠিক করেন, ‘একটা রিস্ক নিয়েই দেখি না!’
ঈদের সালামি ও হাতখরচ থেকে বাঁচানো টাকায় কিছুদিনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে যায় মাহিয়ার উদ্যোগ—হিয়া। প্রথম দিকে শুধু হাতে রং করা টোটব্যাগ বানাতেন। এরপর পাউচ, চুড়ি, ক্রসবডি ব্যাগও এসেছে। এখন আছে ক্লে দিয়ে বানানো সামগ্রী, ফুল, চাবির রিংসহ নানা উপহার ও নিত্য ব্যবহার্য সরঞ্জাম।
মাহিয়ার মতে, হলে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করা যেমন কঠিন, তেমনি কিছু সুবিধাও আছে। রুমমেট, হলের সিনিয়র, জুনিয়র ও বন্ধুদের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায়। ক্রেতাও পাওয়া যায় হাতের কাছে।
মাহিয়া বলেন, ‘হাতে বানানো জিনিসের দাম কিন্তু অনেক বেশি। শিক্ষার্থীরা যেন সুলভ মূল্যে শখের ব্যাগ, চুরি ইত্যাদি মনমতো কাস্টমাইজ করিয়ে নিতে পারে, সে জন্যই হিয়ার জন্ম। ঈদে বিক্রি অন্য সময়ের তুলনায় স্বভাবতই বেশি হয়। কাজের চাপ, ক্লাস–পরীক্ষা, রোজা—সব মিলিয়ে দৈনন্দিন রুটিন অনেকটাই বদলে যায়। কখনো সারা রাত জেগে সাহ্রি পর্যন্ত কাজ করি। সকালে আবার ক্লাস ধরতে হয়। কষ্ট হয় ঠিক, তবে উপভোগও করি। অর্ডারের এ চাপটাই তো একজন ব্যবসায়ীর স্বপ্ন!’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও অনেকেই এখন হিয়ার ক্রেতা।
অন্য রকম শান্তি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মারজিয়া আশরাফি ‘আশরাফি মার্ট’ নামে একটি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করেন। কয়েক বছর আগে অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে একবার বাজে ব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন। জেদ করে সেদিনই নিজের একটা পেজ তৈরি করে ফেলেছিলেন তিনি। প্রথম দুই মাস তেমন সাড়া মেলেনি। তবে ক্যাম্পাসে এখন প্রায় সবার কাছেই ‘আশরাফি মার্ট’ নামটি পরিচিত। ৬০ পিস ব্রোচ পিন দিয়ে শুরু, এখন আশরাফি মার্টে জুয়েলারি, কসমেটিকসসহ নানা কিছু পাওয়া যায়।
মারজিয়া যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখনো হলে থাকতেন না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহজে পণ্য ডেলিভারি করতে ও বেশি সাড়া পাওয়ার জন্যই পরে হলে ওঠেন। এখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রহমতুন্নেসা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। হলে আসার পর মারজিয়ার জন্য কাজ করাটা আরও সহজ হয়েছে। রুমে সারা দিন ক্রেতাদের আনাগোনা লেগেই থাকে, কিন্তু রুমমেটরা কখনো বিরক্ত হন না বলেই জানালেন মারজিয়া।
মারজিয়া আশরাফি ‘আশরাফি মার্ট’ এখন অনেকেই চেনেনঈদের আগে এখন বেশ ব্যস্ততায় সময় কাটছে। কখনো কখনো রাত ১২টা পর্যন্তও দিতে হচ্ছে ডেলিভারি। মারজিয়া বলেন, ‘শুরুর দিকে পরিবার চায়নি আমি ব্যবসা করি। তারা চাচ্ছিল, আমি যেন পড়াশোনায় মন দিই। কিন্তু আমার মধ্যে একটা জেদ ছিল। যে কারণে আজ আমি স্বাবলম্বী। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যে কী আনন্দের, এটা আসলে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি চাইলেই এখন নিজের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ করতে পারি অথবা মা–বাবাকে কিছু উপহার দিতে পারি। এ জন্য আমার কারও কাছে চাইতে হচ্ছে না। নিজের টাকায় কিছু করতে পারার মধ্যেই একটা আলাদা শান্তি থাকে।’
শখ থেকে ব্যবসায়
তাসলিমা মিশুর পুঁজি ছিল মাত্র এক হাজার টাকা। বাসা থেকে হাতখরচের জন্য যে টাকা পাঠানো হতো, সেখান থেকেই একটু একটু করে টাকাটা জমিয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকা ও কারুশিল্পে আগ্রহ, তাই নিজ হাতে তৈরি গয়না দিয়ে ব্যবসার শুরু। বলছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে পড়েছি। আমার ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের ধরাবাঁধা নিয়ম ছিল না। যেকোনো ব্যাচের প্রোডাকশন শুরু হলেই মহড়া ও ক্লাসের সময় বদলে যেত। এ জন্য টিউশন বা খণ্ডকালীন চাকরি করা আমার জন্য সম্ভব ছিল না। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পছন্দের শিল্প চর্চা করা—দুই উদ্দেশ্য নিয়েই আমার উদ্যোগ।’
তাসলিমা মিশুতাসলিমা যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে। হলে থেকে ব্যবসা পরিচালনা করা কিছুটা কষ্টসাধ্য। দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্রেতাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পণ্য নিতে ক্রেতারা ভিড় করলে রুমমেটদের অসুবিধা হয়। তাসলিমা তাই নিজেই গিয়ে গিয়ে পার্সেল দিয়ে আসতেন। কাজও করতেন তখন, যখন কারও পড়ালেখার অসুবিধা না হয়। হলের অধিকাংশ মেয়ের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন বলেই জানালেন।
জামদানি শাড়ির প্রতি আগে থেকেই দুর্বলতা ছিল। যেখানেই সুন্দর শাড়ি দেখতেন, কিনতে ইচ্ছা করত। সেই দুর্বলতা থেকেই এখন জামদানি নিয়েও কাজ করছেন। হলজীবনে ছোট্ট পরিসরে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, এখন তা বেশ বড় হয়েছে। বেড়েছে ক্রেতার সংখ্যা।
হাজারের বেশি লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন ডা. মমতাজ, পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতাযাত্রা সহজ নয়
তাসলিমা, মারজিয়া, মাহিয়ারা এভাবে নিজেরাই শুধু স্বনির্ভর হচ্ছেন না, অন্য অনেকের কর্মসংস্থানও করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয়ই গড়ে উঠছে ছোট ছোট বাজার।
তবে সবার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ ততটা মসৃণ হয় না। তাসলিমা যেমন বলছিলেন, ‘বড় না হলে সমাজ কখনো বাহবা দেয় না। বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী এই বিষয় নিয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করে। মেয়েদের উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টা সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারার মতো সুন্দর মানসিকতা এখনো সবার মধ্যে তৈরি হয়নি।’ ভবিষ্যতে যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের জন্য মাহিয়ার পরামর্শ, ‘কথায় বলে না—নো রিস্ক, নো গেইন। ঝুঁকি নিতেই হবে। তবে হিসাব করে। এমন ঝুঁকিই নিতে হবে, যেন লাভ–লোকসান যা–ই হোক, আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারি।’