জেন–জির মুখে ‘গালির ভাষা’ ও মাতৃভাষা রক্ষার দায়

· Prothom Alo

জুলাই ২০২৪ ও এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে তরুণ প্রজন্মের প্রবল উত্থান। বৈষম্যবিহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে শুরু হওয়া তাদের এই আন্দোলন ছিল জরাজীর্ণ কাঠামোকে ভেঙে নতুন কিছু সৃষ্টির আন্দোলন।

Visit chickenroadslot.pro for more information.

যেকোনো ভালো কিংবা মন্দ কিছুকে ছড়িয়ে দিতে মাধ্যম খুব গুরুত্বপূর্ণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ভাষা। ভাষায়ই আমাদের মুক্তি, আমাদের সমৃদ্ধি। ভাষায় সম্মান আবার ভাষায়ই অপমান। আবার কখনো কখনো ভাষার অনিয়ন্ত্রিত ও অবিবেচক ব্যবহার হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। তাই ভাষার ব্যবহার হতে হয় নিয়ন্ত্রিত। ভাষার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পরিণতি কী হতে পারে, তা ২০২৪–এর জুলাই-আগস্টে দেখেছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনে অনেকখানি ভূমিকা রেখেছিল তাঁর অনিয়ন্ত্রিত ভাষার ব্যবহার।

আন্দোলন ও এর পরবর্তী সময়ে জেন–জি নামে যে প্রজন্মকে আমরা চিনেছি, তাতে মনে হয়েছে, তারা নিজেদের প্রজন্মটিকে অন্য প্রজন্ম থেকে একটু আলাদা করে ভাবতে ভালোবাসে। প্রজন্মের স্বকীয়তা হিসেবে তারা যা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে, তা হলো তারা অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তারা নতুনের পক্ষে, তারা সুন্দরের পক্ষে। তাদের এই স্বকীয় অবস্থানের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে চাই, তাদের এই আকুতি সর্বস্তরের কাছে পৌঁছে দিতে শুদ্ধ ও সাবলীল বাংলা ভাষা শেখা ও তার চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জেন–জির যে প্রবণতা আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করে, তা হলো অপ্রত্যাশিত ভাষার সঙ্গে তাদের অনেকের সমঝোতা ও বন্ধুত্ব। শুধু তা–ই নয়, গালিতে ব্যবহৃত অনেক শব্দ তারা তাদের প্রতিদিনের শব্দভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং খুব সহজাতভাবে তারা সেগুলো প্রয়োগ করছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক আলাপের সীমা ছাড়িয়ে তাদের গালির ভাষা ঢুকে পড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপে, আন্দোলনের স্লোগানে, বক্তৃতার ভাষায়, সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্টে ও কমেন্টে।

আমি বিশ্বাস করি, আজকের তরুণেরাই পারে কদর্য ভাষা ব্যবহারের এই প্রবণতাকে রুখে দিতে। নোংরা কমেন্ট কিংবা স্লোগান নয়; বরং তরুণদের মাধ্যমে ভাইরাল হোক সুন্দর ও সাবলীল ভাষা। তাদের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হোক ভাষার নারীর সম্মান।

গালিতে যে যত বেশি পারদর্শী, সে যেন তত বেশি স্মার্ট। গালিকে পুঁজি করে কেউ কেউ হয়ে উঠছেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, কেউবা বক্তা আবার কেউবা নেতা। আগে নারীদের মধ্যে অসৌজন্যমূলক ভাষা ও গালির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম দেখতাম। কিন্তু আজকাল এ ক্ষেত্রে তরুণীরাও পিছিয়ে নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, আগের প্রজন্ম কি কদর্য ভাষা ব্যবহার করত না? উত্তরটি অবশ্যই ‘হ্যাঁ’। গালি ব্যবহারের ইতিহাস অনেক পুরোনো। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত কদর্য ভাষার গণ্ডি অনেকটা ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্লোগানে, বক্তৃতায়, সামাজিক আড্ডায়, লেখায় আমরা গালির ভাষার প্রয়োগ প্রায় দেখিনি বললেই চলে।

তরুণদের বুঝতে হবে, ভাষার কদর্যতা আর গালির ইতিহাস মূলত ক্ষমতার রাজনীতির ইতিহাস। ভাষা শুধু যে ভাব প্রকাশের মাধ্যম তা কিন্তু নয়; বরং ভাষা সমাজে বৈষম্য টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় হাতিয়ার। শব্দ নির্বাচন আর প্রয়োগের রাজনীতি যুগে যুগে নির্ধারণ করেছে মানুষের সামাজিক অবস্থান কিংবা মানুষের সামাজিক অবস্থানকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে শব্দভান্ডার।

কাউকে আক্রমণের চরম অস্ত্র হিসেবে আমরা যে অশ্লীল শব্দগুলো প্রয়োগ করি, মূলত সেগুলোই গালি হিসেবে পরিচিত। ‘গালি’ নামক অদৃশ্য এই অস্ত্রের আঘাত ধারালো ছুরি-কাঁচির চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়; বরং বেশি। কারণ, এর আঘাত মানুষের হৃদয়কে রক্তাক্ত করে। শরীরের আঘাত হয়তো একসময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু মনের আঘাত রয়ে যায় সারা জীবন।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে বাংলা ভাষায় প্রচলিত গালির অধিকাংশই নারীর শরীর, মনস্তত্ত্ব, কর্মদক্ষতা, সামাজিক অবস্থান কিংবা তাঁর যৌনতাকে কটাক্ষ করে আবর্তিত। নারীর প্রতি ইঙ্গিত ছাড়া গালি যেন ঠিক পূর্ণতা পায় না। কারণটি হলো, সমাজ জানে, সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোতে নারীর অবস্থান পুরুষের নিচে। তাই অসম্মানজনক নোংরা ভাষা ও গালির ব্যবহার ক্ষমতার রাজনীতিকে উসকে দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে কাজ করে। আমি জানি না তরুণেরা বিষয়টি তলিয়ে দেখে কি না! ভাষায় নারীর সম্মান রক্ষার ব্যাপারে তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

অশুদ্ধ ও অসুন্দর ভাষার মাধ্যমে কখনো সুন্দর স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি ছড়ানো যায় না। কেউ কেউ বলতে পারেন, প্রতিবাদের ভাষা কড়া হতে হয়। এ বিষয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কড়া ভাষার অর্থ নোংরা ভাষা নয়। তাই তরুণদের বেছে নিতে হবে সেই ভাষা, যা প্রতিবাদী হবে কিন্তু অবমাননাকর হবে না। ভাষা কড়া হবে কিন্তু কদর্য হবে না। ভাষা অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করবে কিন্তু দুর্বল কিংবা প্রান্তিককে আঘাত করবে না।

ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষার সম্মান সবার আগে। আর ভাষার সম্মান রক্ষা করা যায় তখনই, যখন ভাষার মাধ্যমে রক্ষা করা যায় মানবিকতা আর সম্মান। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে পেয়েছি। তাই কোনোভাবেই এই ভাষার সম্মান হারানো যাবে না। মাতৃভাষাকে শুধু মুখের কথায় ‘মায়ের ভাষা’র মুকুট পরিয়ে না রেখে ভাষার সম্মান বজায় রাখতে যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

আমি বিশ্বাস করি, আজকের তরুণেরাই পারে কদর্য ভাষা ব্যবহারের এই প্রবণতাকে রুখে দিতে। নোংরা কমেন্ট কিংবা স্লোগান নয়; বরং তরুণদের মাধ্যমে ভাইরাল হোক সুন্দর ও সাবলীল ভাষা। তাদের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হোক ভাষার নারীর সম্মান।

যে তরুণ সত্যের আর সুন্দরের জন্য সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে, হাসিমুখে রক্ত দিতে পারে, সে তরুণ কেন ভাষায় নারীর সম্মান, মানুষের সম্মান রক্ষা করতে পারবে না? সত্য, সুন্দর আর শুদ্ধ ভাষার চর্চার মাধ্যমে রচিত হোক মানবতার জয়। তরুণের বিজয়গাথা ছড়িয়ে পড়ুক শুদ্ধ আর সুন্দর ভাষাকে সঙ্গী করে।

নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী

[email protected]

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

Read full story at source