একমুঠো খেজুরের বিচি আর সভ্যতার প্রতিচ্ছবি
· Prothom Alo

২০১৪ সালের ডিসেম্বরের একটি দিন আমার মননে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অর্থনীতির ক্লাস শেষে মসজিদে নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর হাতে ছিল কয়েকটি খেজুরের বিচি। দুই ঘণ্টা ধরে কোবে এবং সান্নোমিয়া স্টেশনের রাস্তায় হাঁটলাম, কেনাকাটা করলাম, কিন্তু কোথাও ময়লার স্তূপ তো দূরের কথা, একটি ছোট ময়লাও চোখে পড়ল না। শেষে রোক্কো স্টেশনের পাশে একটি ডাস্টবিন খুঁজে পেলাম, কিন্তু চারপাশের পরিচ্ছন্নতা দেখে সেখানে ময়লা ফেলতেও সংকোচ হচ্ছিল। সেদিন উপলব্ধি করি—পরিচ্ছন্নতা কেবল আইন দিয়ে হয় না; এটি সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ। এটি একটি সভ্যতার প্রতিচ্ছবি।
দেশে ফিরে নির্মম বাস্তবতা জাপান থেকে ফিরে দেশের চিত্র দেখে আমি মর্মাহত হই। রাস্তাঘাট, নালা, নদীর পাড় আজ প্লাস্টিক বর্জ্যে সয়লাব। চিপস ও চকলেটের প্যাকেট, পানির বোতল আর শ্যাম্পুর মোড়ক যেন আমাদের অসচেতনতার নীরব সাক্ষ্য। আমরা ‘সোনালি আঁশের দেশ’ নিয়ে গর্ব করি, অথচ বাস্তবে পাটের ঐতিহ্য ছেড়ে প্লাস্টিকের দাসত্ব করছি। আমার জন্মস্থান রংপুরে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে বা আমার প্রিয় শহর রাজশাহীর মতিহার চত্বরে প্লাস্টিকের স্তূপ দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। এই দূষণ আমাদের উন্নয়নের নয়, বরং ধীর অবক্ষয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
Visit truewildgame.online for more information.
অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা
অর্থনীতি ও পরিবেশের মেলবন্ধন ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার সময় ‘রিটার্ন অ্যান্ড আর্ন’ ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হই। সেখানে প্লাস্টিক বোতল বা ক্যান ফেরত দিলে প্রতিটির জন্য ১০ সেন্ট পাওয়া যায়। আমার সন্তানরা এই অর্থ দিয়ে খেলনা কিনতে শিখেছে, যা তাদের শৈশবেই পরিবেশ সচেতন করেছে। নিউ সাউথ ওয়েলসে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৫ বিলিয়নের বেশি কনটেইনার পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে এবং জনগণ ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছে। এটি কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, একটি কার্যকর অর্থনৈতিক মডেলও। অস্ট্রেলিয়ায় ধুলোবালি থাকলেও তারা সেই ধুলার মধ্যেই সবুজ ঘাস আর উন্নত নাগরিক মানসিকতায় সমৃদ্ধ শহর গড়ে তুলেছে।
মাটির পাত্র বা বাঁশ-বেতের ব্যবহারে ফিরে যাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া নয়; বরং এটি একটি সচেতন অগ্রযাত্রা। সার্কুলার ইকোনমি এবং লোকশিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাই আমাদের মুক্তির পথ।
গবেষণার আলো
টেকসই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন আমি দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পাই। ‘ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি’তে আমাদের পোশাকে ভাড়ার মডেল গবেষণায় দেখা গেছে, এটি জলবায়ুর ওপর প্রভাব ৪৪ থেকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। এর জন্য আমরা উপাচার্যের রিসার্চ এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডও পাই। অন্যদিকে, ‘ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি’তে আমার পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে—অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দূষণ বাংলাদেশের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করছে। বন্যা, তাপপ্রবাহ ও খরার মতো দুর্যোগগুলো আমাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে, যার শিকার হচ্ছে মূলত দরিদ্র মানুষ।
ঢাকার ধামরাইয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের এক পাশে পৌরসভার ট্রাকে ফেলা হচ্ছে বর্জ্যলোকশিল্প ও প্রকৃতি
আমাদের হারানো শক্তি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় আমরা দেখেছি—মাটির পাত্র, বাঁশের ঝুড়ি, কলাপাতা, পাট ও বেতের পণ্য প্লাস্টিকের নিখুঁত বিকল্প। চায়ের দোকানে মাটির ভাঁড় ব্যবহার করলে প্লাস্টিক কাপের বর্জ্য শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এতে একদিকে কুমোরদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে মাটির পাত্র মাটিতেই মিশে যাবে। কলাপাতা বা বাঁশের পণ্য কয়েক মাসে পচে যায়, যা কোনো বর্জ্য তৈরি করে না। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতিভিত্তিক এই সমাধানগুলো জলবায়ু অভিযোজন ব্যয় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংকটের গভীরতা বাংলাদেশ আজ চরম জলবায়ু ঝুঁকিতে। ঢাকায় প্রতিদিন ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ১০-৩৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। বছরে দেশে প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয় এবং বছরে প্রায় ৩ দশমিক ১৫ থেকে ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বোতল ব্যবহৃত হয়। এর বিশাল অংশ শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
বিশ্বের সমাধান
আমাদের শিক্ষণীয় প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সফল মডেল আমরা অনুসরণ করতে পারি: ১. জার্মানি ও নরওয়ে: ডিপোজিট রিটার্ন স্কিমের মাধ্যমে ৯০ শতাংশের বেশি বোতল পুনর্ব্যবহার করছে। ২. রুয়ান্ডা: প্লাস্টিক ব্যাগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে কিগালিকে অন্যতম পরিষ্কার শহর বানিয়েছে। ৩. ইউরোপীয় ইউনিয়ন: সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক স্ট্র ও কাটলারি নিষিদ্ধ করেছে। ৪. জাপান: ‘মোত্তাইনাই’ সংস্কৃতির মাধ্যমে শৈশব থেকেই অপচয় না করার নৈতিক শিক্ষা দেয়। ৫. কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়া: ‘পে-অ্যাজ-ইউ-থ্রো’ মডেলে বর্জ্য তৈরির পরিমাণের ওপর ফি ধার্য করা হয়। ৬. ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন: ‘ওয়েস্ট ব্যাংক’ চালুর মাধ্যমে বর্জ্য জমা দিয়ে মানুষের সঞ্চয় সুবিধা দিচ্ছে।
করণীয়
নীতি ও সামাজিক পরিবর্তন এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পলিথিন নিষিদ্ধের পাশাপাশি পাট, মাটি ও বাঁশের বিকল্প পণ্যে ভর্তুকি দিতে হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে ডিপোজিট রিটার্ন স্কিম চালু করা জরুরি। স্কুল পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ‘ওয়েস্ট ব্যাংক’ চালু করতে হবে। পুনর্ব্যবহারভিত্তিক উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। পরিচ্ছন্নতা কেবল সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
শেষ কথা
মাটির পাত্র বা বাঁশ-বেতের ব্যবহারে ফিরে যাওয়া মানে পিছিয়ে পড়া নয়; বরং এটি একটি সচেতন অগ্রযাত্রা। সার্কুলার ইকোনমি এবং লোকশিল্পভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাই আমাদের মুক্তির পথ। প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলেই আমাদের পরিবেশ ও অর্থনীতি টেকসই হবে। প্লাস্টিক ত্যাগের সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে; কারণ, বিলম্ব মানেই মহাবিপর্যয়। তবেই আমাদের ‘সোনালি আঁশের দেশ’ আবারও সত্যিকারের সমৃদ্ধ ও টেকসই হয়ে উঠবে।
লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন, অধ্যাপক, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।