ইরানে ট্রাম্পের মহাবিপর্যয় ঘটানোর হুমকি ক্ষমতার নয়, বরং নৈতিক ও কৌশলগত দুর্বলতার লক্ষণ

· Prothom Alo

জেনেভা কনভেনশনের প্রথম অতিরিক্ত প্রটোকলের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রটোকলের ভিত্তিতেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য দায়ী রুশ সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

ইউক্রেনের শহর ও জনপদে আতঙ্ক ছড়াতে এবং মনোবল ভেঙে দিতে যে ধরনের হামলা ও একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে এ সপ্তাহে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন তা যদি কার্যকর করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই আইন প্রযোজ্য হবে।

এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক আইনের এই মৌলিক বিষয়গুলো বারবার মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যখন ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক রক্তপিপাসু উন্মাদনার মধ্যে থেকে কথা বলছেন বলে মনে হচ্ছে। পেন্টাগন থেকে মৃত্যু ও ধ্বংসের আদেশ দেওয়ার সক্ষমতাকে কুৎসিতভাবে উদ্‌যাপন করছেন হেগসেথ। এই ইভানজেলিক্যান খ্রিষ্টান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’কে একুশ শতকের ক্রুসেড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো ‘অধার্মিকদের ধ্বংস করে দেওয়া’।

গত সপ্তাহান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে অশ্লীল গালিতে পূর্ণ এক বার্তা দিয়েছেন। ক্রোধ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ খুলে না দেয়, তবে ‘মঙ্গলবার হবে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে (বিদ্যুৎকেন্দ্র দিবস) এবং ব্রিজ ডে (সেতু দিবস); ওই...(প্রকাশ অযোগ্য গালি) প্রণালি খুলে দাও উন্মাদরা, না হলে তোমরা নরকে বাস করবে’। এই বার্তার মাধ্যমে মূলত হামলা চালিয়ে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।

এই গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার ২৫০তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে এ ধরনের ভাষা ট্রাম্পের দপ্তর এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে কলঙ্কিত করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সুনাম এবং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও ক্ষুণ্ন করছে, যা তিনি ইতিমধ্যে অনেকখানি করে ফেলেছেন। একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যরা ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফির পরামর্শ মানতেন এবং তাঁকে অপসারণের সাংবিধানিক পথ খুঁজতেন। কিন্তু ট্রাম্পের চারপাশে থাকা লোকজনের নির্লজ্জ আনুগত্যের কারণে সেই সম্ভাবনা বর্তমানে ক্ষীণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই অবৈধ যুদ্ধের বিধ্বংসী বিস্তার যাতে না ঘটে, তা নিয়ে অপেক্ষা ও আশায় থাকা ছাড়া এখন বাকি বিশ্বের আর কোনো উপায় নেই। এমন বিস্তার ঘটলে এর পরিণাম হবে অজানা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইরান ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছে, তারা প্রতিবেশী অঞ্চলের ভেতরে ও বাইরে নিজেদের হামলার পরিধি আরও বাড়াবে। ট্রাম্প দম্ভভরে ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করলেও এটি যে ইরানের নিছক ফাঁকা বুলি নয়, তার প্রমাণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করা যুদ্ধাপরাধ হলেও তা নিয়ে ‘চিন্তিত’ নন ট্রাম্পমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। পাশে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন (ডানে)। হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্র, ৬ এপ্রিল

এই যুদ্ধে যোগ না দিয়ে ট্রাম্পের এই হঠকারিতাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করে ন্যাটো মিত্ররা সঠিক কাজটিই করেছে। তারা এই যুদ্ধের পেছনে কোনো সুসংগত কৌশলগত পরিকল্পনা এবং কোনো আইনি ভিত্তি খুঁজে পায়নি। তারা এখন আশা করছে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বিপর্যয় ঘটানোর বাগাড়ম্বর হয়তো দ্রুত যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ খোঁজারই অংশ। ট্রাম্প তাঁর চরম হুঁশিয়ারির পরপরই দাবি করেছেন, মঙ্গলবারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েল ইরানের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে যা মনে আসছে তা-ই করছেন। সোমবার হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এবং হেগসেথ দক্ষিণ ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করেন। আগামী কয়েক ঘণ্টায় হাজার হাজার মানুষের জীবন এবং বিশ্ব অর্থনীতির তাৎক্ষণিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের খামখেয়ালির ওপর, যিনি কেবল নিজের আত্মতুষ্টির প্রবৃত্তি এবং স্তাবক উপদেষ্টাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন।

ট্রাম্প ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’: বলছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা

Read full story at source