চিলি: এক দেশ, বহু পৃথিবী ৭

· Prothom Alo

সান্তিয়াগোর কনস্টিটিউশন স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে লেখক প্রত্যক্ষ করেন ইতিহাস, বিপ্লব আর গণতন্ত্রের স্মৃতি। পাজ ও মেথিয়াসের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে চিলির রাজনৈতিক অতীত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীরতা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বিপ্লবী চিলি

সান্তিয়াগোর ‘কন্সটিটিউশন স্কোয়ার’

দাঁড়িয়ে আছি সান্তিয়াগোর একটি সুবিশাল চত্বরে। সান্তিয়াগোর পথে পথে চলতে গিয়ে পরিচিত হয়েছি চিলিয়ান নারী পাজের সঙ্গে। পাজ আমার পাশে আছে, সঙ্গে আছে পাজের প্রেমিক মেথিয়াস। পাজ আমায় বলল, তুমি দাঁড়িয়ে আছ আমার দেশের প্রশাসনিক হৃদয়ে। এ সুবিশাল চত্বরকে সেটাই ভাবি আমরা। পাজ আরও বলল, ‘এ জায়গার নাম “কনস্টিটিউশন স্কোয়ার (Plaza de la Constitución)”। পাশেই রাষ্ট্রপতি ভবন। আর এদিকটায় এটা একটা উন্মুক্ত আনুষ্ঠানিক নাগরিক চত্বর। এখানে এসে রাষ্ট্রের মানুষ অকৃত্রিম হয়। কী সরকারি অনুষ্ঠান, কী প্রতিবাদ, কী জাতীয় আয়োজন সব এখানেই হয়।’ আমি এ চত্বরের সঙ্গে মিল পাচ্ছি আমাদের সংসদ ভবন আর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ–সংলগ্ন এলাকার।

পাশের রাষ্ট্রপতি ভবনের দেয়ালে সূর্যের আলো পড়ে এর জৌলুশ আরও বাড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভবনের নাম ‘লা মোনেদা প্রাসাদ’। হালকা বাতাসে চিলির পতাকা পতপত করে উড়ছে এখানে সেখানে যেদিকে তাকাচ্ছি। এখন এই সকালে এ চত্বর নিঃশব্দ প্রায়। অথচ এই নীরবতায় আমি দেখতে পাচ্ছি বিক্ষোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, স্বপ্ন আর গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম।

কালচারাল সেন্টারে লেখক

অদূরে একটি পরিচিত মুখ; পাথরের; যেন আমায় ডাকছে। যেন বহুদিনের চেনা! বহুকালের বন্ধন!  আমি পা বাড়ালাম সম্মোহনে। কাছে গিয়ে দেখি, আমি ঠিক চিনেছি, তিনি আলেন্দে। আমার কিশোর বয়সে যাঁদের গল্পে আর বীরত্বে আমার মনন তৈরি হয়, আলেন্দে তাঁদের একজন। না, তিনি সেদিন পিছু হটেননি। আমি ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের কথা বলছি। সামরিক যুদ্ধবিমান ঘুরছিল তাঁর ভবনের ওপরে, আকাশে। ওপর থেকে যখন বোমা ফেলা হচ্ছিল, তিনি ভাবলেন ধরা তো তিনি দেবেন না। তিনি ধরা পড়বার আগে আত্মাহুতি দিলেন। এই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দরজা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। এই প্রাসাদের দরজা দিয়ে তাঁর নিথর দেহ বেরিয়েছিল। পরে গণতন্ত্র ফিরে এলে দরজাটি আবার খুলে দেওয়া হয়। আমি আজ সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপছি।

পাজকে বললাম, আমায় একটা ছবি তুলে দেবে আলেন্দের সঙ্গে? সে সাগ্রহে বেশ ক’খানা ছবি তুলে দিল। চারদিকে আরও কিছু ভাস্কর্য দেখিয়ে সে বলল এগুলো সব আমাদের এক এক সময়কার প্রেসিডেন্টের ভাস্কর্য। যাঁরা আজকের এই চিলি তৈরি করে দিয়েছেন বলে আমরা আজ এত নির্ভয়। আমি দেখছি এখানেই মজুত আছে চিলির সব মর্যাদা।

আমি এখনো আলেন্দের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে। রাজনায়কেরা ফিরে ফিরে আসেন। তাঁরা অমর। ১৯৯০ সালে যখন সামরিক শাসনের অবসান হয়, চিলি ধীরে ধীরে তাদের রাজনৈতিক অতীতকে পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করে। আলেন্দের ভাস্কর্য স্থাপন সেই প্রক্রিয়ার অংশ। ভাস্কর্যে স্থির, দৃঢ়, সামনের দিকে অগ্রসরমাণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এই বুঝি আমার সঙ্গে করমরদন করবেন!

এদিকটায় সুশৃঙ্খল গাছের সারি, প্রশস্ত পাথরের মেঝে, চারদিকে দৃঢ় স্থাপত্য পরিবেশ আর আকাশে উড়ছে চিলিয়ান পতাকা।

আমি পাজের সঙ্গ পাওয়ায় সান্তিয়াগোতে আমার দিনটা বেশ আরামের হয়ে উঠল। আমি কিছু বুঝতে না পারলেই সে এগিয়ে এসে আমায় বুঝিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে থাকা পাজের প্রেমিক মেথিয়াস ছেলেটিও ভীষণ অমায়িক। তার প্রেমিকায় ভাগ বসিয়েছি সকাল থেকে কিন্তু তার কোনো বিরক্তি নেই তাতে। মেথিয়াস থাকে আর্জেন্টিনা।

কালচারাল সেন্টার

পাজ আমাকে আর মেথিয়াসকে বলল, তোমাদের এক ঝলকে সিনেমার ট্রেলারের মতো চিলি দেখাতে একটি সাংস্কৃতিক ও শিল্পকেন্দ্রে নিয়ে যেতে চাই। আমি তো নগদ যা পাই হাত পেতে নেই। আমার জন্য সব লাভ এখানে। রাজি হয়ে গেলাম। সামান্য কাছে হেঁটে গিয়ে দেখি বৃহৎ দেয়ালে লেখা ‘Centro Cultural La Moneda’; অর্থাৎ এটি তাদের কালচারাল সেন্টার।

প্রবেশপথেই মনে হলো পাজ আমাদের মাটির তলে নিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে বলছে, এখানে দুটি প্রদর্শনী হল আছে। পাজ কথা বললে মনে হয় গল্প বলছে। পাজ বলছে, চিলি তার স্বাধীনতার দুই শ বছর উদ্‌যাপন করবে বলে ঠিক করল। রাষ্ট্রের সব রথীমহারথীরা বসল আলোচনায়। ভাবল কী করা যায়, যাতে চিলিয়ান সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরা যায়। সেই ভাবনা থেকে এই কালচারাল সেন্টার।

কালচারাল সেন্টারের প্রদর্শ

১৬০০–১৮০০ চিলি ছিল স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনে। ১৮১০ সালে স্পেনে নেপোলিয়নের আগ্রাসনের ফলে দেখা দেয় রাজনৈতিক সংকট। সে সময় স্পেনের রাজা সপ্তম ফার্নান্দোকে আটক করা হয়, ফলে ঔপনিবেশিক শাসনে নেমে আসে শূন্যতা। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮১৮, চিলি আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের শাসন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পুরো দেশ সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য ১৮২৬ সাল পর্যন্ত আমাদের লড়াই চালাতে হয়েছিল।

পাজকে বললাম, তোমাদের সঙ্গে আমাদের একটা ঐতিহাসিক মিল আছে। সেটা হলো, চিলি ছিল স্পেনের উপনিবেশ। আমরা ছিলাম ব্রিটিশদের অধীনে। আমরা তোমাদের এক শ বছর পর স্বাধীন হয়েছি। তোমাদের ক্ষেত্রে নেপোলিয়নের আক্রমণে স্পেন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের অর্থনীতি দুর্বল হয়, ফলে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ দুর্বল হতে থাকে। তোমাদের নেতা ছিল বার্নার্দো ও’হিগিন্স, আমাদের ছিল মহাত্মা গান্ধী। তোমাদের যুদ্ধের সবটাই সামরিক কিন্তু ভারতবর্ষে সামরিক আন্দোলনের পাশাপাশি গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনও প্রভাব রেখেছে। দুই ক্ষেত্রেই ভূমিকা রেখেছে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। দেখেছ কেমন মিল তোমাদের আর আমাদের?
হো হো করে হেসে ফেললাম আমরা দুই মহাদেশের তিনজনা।
আমরা মাটির নিচে ঢুকে পড়েছি। যেন কোন বাঙ্কারে। কিন্তু আলোর কোনো স্বল্পতা নেই। খেয়াল করে দেখলাম আলো আসছে ওপরের কাচের ভল্টের মাধ্যমে। বড় বড় প্রদর্শনী ঘরে হস্তশিল্প, বয়নশিল্প, নানা চিত্রকলা, ভাস্কর্য। এখানে বন্দুক নেই আছে তুলির আঁচড়। এখানে শ্বেত দেয়ালে কোনো ঘোষণাপত্র নেই, আছে প্রদর্শনী। এ সেন্টারে স্বাধীনতা শব্দটি রাজনীতির নয়, সৃজনশীলতার।

ছবি: লেখক

Read full story at source