মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

· Prothom Alo

এক বছরে চার শতাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা আমাদের সমাজ, পরিবার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে কতটা উপেক্ষিত। অথচ মানসিক সংবেদনশীলতার দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক এই সময়ে শিশু–কিশোর ও তরুণেরা নানা মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও হতাশায় ভোগেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং, সহিংসতাও নারী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার পেছনে বড় একটি কারণ।

Visit freshyourfeel.org for more information.

সম্প্রতি আত্মহত্যা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, হতাশা, অভিমান, প্রেম, পারিবারিক টানাপোড়েন, মানসিক অস্থিতিশীলতা ও যৌন নির্যাতনের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন। করোনা মহামারির অভিঘাতের কারণে ২০২২ (৫৩২ জন) ও ২০২৩ (৫১৩ জন) সালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যা বেড়েছিল। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা কমে ৩১০ হলেও ২০২৫ সালে আবারও বেড়েছে।

গত বছর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই স্কুলপড়ুয়া। এ তথ্যই প্রমাণ করে, আমাদের শিশুদের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা নিশ্চিত করে যে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভর। নীতিনির্ধারক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের এটা বুঝবে হবে যে পিঠে বইয়ের ব্যাগের বড় বোঝা, কোচিং–প্রাইভেট আর ভালো ফল মানেই ভালো শিক্ষা নয়। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, শিক্ষাবিদদের সতর্কতার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বৃত্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ক্লাসে পরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক এসব পরীক্ষা শিশুদের ওপর বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আত্মহত্যাপ্রবণতা বেশি। গত বছর মোট আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর ৬২ শতাংশই ছিল নারী শিক্ষার্থী। এ তথ্যই বলে দেয়, আমাদের পরিবার, সমাজ ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি এখনো যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার বড় কারণ হলো, পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাজনিত চাপ।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, সব বয়সী মানুষের মধ্যেই আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য জানাচ্ছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর অর্থ গড়ে প্রতিদিন ৪১ জন আত্মহত্যা করেছেন। আমরা মনে করি, আত্মহত্যার এই সুনামি প্রতিরোধে সরকারকে অবশ্যই নাগরিকের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা জরুরি। নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সংবেদনশীল শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে তাদের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে পারার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদের এটা মনে রাখা জরুরি যে অহেতুক প্রতিযোগিতার চাপ তাদের সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

শিক্ষার্থী–অভিভাবক-শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও গণমাধ্যম প্রচারণার মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব। সাইবার বুলিংসহ ডিজিটাল পরিসরে সংঘটিত যেকোনো অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

Read full story at source