ঈদ আনন্দ দেশে দেশে: মালয়েশিয়ার ‘মালাম রায়া’–র উৎসবমুখর রাত

· Prothom Alo

আমি ভ্রমণপিপাসু মানুষ। পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে বেড়ানোই আমার নেশা। তবে আমার ভ্রমণের উদ্দেশ্য শুধু বড় বড় শহর বা আধুনিক স্থাপনা দেখা নয়; বরং আমি খুঁজে দেখি সেই দেশের গ্রামীন জীবন, প্রকৃতির রূপ, গ্রামের রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার ও মানুষের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি। একটি দেশের প্রকৃত সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য এসবের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। তাই সুযোগ পেলেই আমি ছুটে যাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিমপ্রধান দেশ মালয়েশিয়া আমার ভ্রমণজীবনের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতার নাম। আধুনিকতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের এক অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দেশ সত্যিই বিস্ময় জাগায়। কুয়ালালামপুরের আকাশচুম্বী পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার আধুনিক স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক, যা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

Visit livefromquarantine.club for more information.

মালয়েশিয়াকে আমার কাছে আরও আপন মনে হয়। কারণ, এটি একটি মুসলিম দেশ। এখানকার সংস্কৃতি, মানুষের আন্তরিকতা ও খাবারের বৈচিত্র্য ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে নাসি গোরেং, নাসি প্রেন্ডাংসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ মন ভরিয়ে দেয়। ফলের প্রাচুর্যের জন্যও মালয়েশিয়া বিখ্যাত। রামবুটান, পেঁপে, পেয়ারা, আমসহ নানা ধরনের ফল রাস্তার পাশের বাজারে সহজেই পাওয়া যায়।

প্রকৃতির দিক থেকেও মালয়েশিয়া অনন্য। প্রায় সারা বছরই এখানে বৃষ্টি হয়, ফলে দেশজুড়ে সবুজের সমারোহ চোখে পড়ে। আবহাওয়াও বেশ সহনীয়, না খুব বেশি গরম, না তীব্র শীত। দিনের বেলায় কিছুটা গরম অনুভূত হলেও রাতের কোমল বাতাস পরিবেশকে করে তোলে আরামদায়ক।

শৈশবে আমি বাংলাদেশের ঈদের আনন্দ উপভোগ করেছি। পরবর্তী সময় ইন্দোনেশিয়া, হংকং, কোরিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ঈদ উদ্‌যাপন দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার ঈদ উদ্‌যাপনের একটি দিক আমার কাছে বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে, ঈদের আগের রাতের উৎসবমুখর পরিবেশ।

মালয়েশিয়ার মালাক্কায় এক রমজানের স্নিগ্ধ সন্ধ্যা

মালয়েশিয়ায় ঈদের আগের রাতকে বলা হয় ‘মালাম রায়া’ (Malam Raya)। চাঁদ দেখা যাওয়ার পর এই রাত যেন আনন্দ ও উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শুরু হয় ঈদের আনন্দঘন প্রস্তুতি। মসজিদ, রাস্তা ও পাড়া-মহল্লাজুড়ে ধ্বনিত হতে থাকে ‘তাকবির রায়া’ (Takbir Raya)—

‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।’

অনেক জায়গায় তরুণেরা গাড়ি বা মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করতে করতে তাকবির পাঠ করেন। আবার কোথাও মসজিদে সমবেতভাবে তাকবির ধ্বনি ও ইসলামি সুরে ঈদের আনন্দ প্রকাশ করা হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজায়, অনেক স্থানে আতশবাজির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পাড়া-মহল্লা।

এই সময় ঘরে ঘরে চলে ঈদের প্রস্তুতি—নতুন পোশাক, মিষ্টান্ন ও বিশেষ খাবারের আয়োজন। পরিবার-পরিজন সবাই মিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পরদিনের ঈদ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতিতে। চারদিকে যেন আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও ধর্মীয় আবহ একসঙ্গে মিশে যায়।

মালয়েশিয়ার এই ‘মালাম রায়া’কেবল একটি উৎসবের প্রস্তুতি নয়; এটি মুসলিম সমাজের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতির এক অপূর্ব প্রকাশ। দূর প্রবাসে থেকেও এই দৃশ্য অনেককে নিজের মাতৃভূমির ঈদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

ঈদ তাই শুধু আনন্দের একটি দিন নয়; এটি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং মানবিক বন্ধনের এক মহামিলন। পৃথিবীর যেখানেই মুসলমানেরা বাস করুক না কেন, ঈদের এই আনন্দ তাঁদের হৃদয়কে একসূত্রে গেঁথে দেয়।

দূর দেশে দাঁড়িয়ে যখন রাতের আকাশে তাকবিরের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন মনে হয়—মানুষের ভৌগোলিক দূরত্ব যতই থাকুক, ঈদের আনন্দ আমাদের সবাইকে একই অনুভূতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। প্রবাসের আকাশেও তখন ভেসে ওঠে শৈশবের সেই চিরচেনা ঈদের সকাল, গ্রামের মসজিদের মাইকে ভেসে আসা তাকবির আর আপনজনদের মুখভরা হাসি।

ইন্দোনেশিয়ায় রাতে তারাবিহ, গ্রামের নিস্তব্ধতা আর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source