এবার ঈদের ছুটিতে বিদেশি পর্যটনে ভাটা, দেশে ভিড়

· Prothom Alo

বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ কমছে। ভারতের ভিসা বন্ধ দেড় বছর ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ফ্লাইটের টিকিট চড়া।

বাংলাদেশে বেড়ানোর ক্ষেত্রে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ কমছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় ভ্রমণ বাতিল করছেন কেউ কেউ। বিদেশে বেড়াতে যেতে বেড়েছে ভিসা জটিলতা। উড়োজাহাজের টিকিটের দামও চড়া। তাই এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটিতেও বিদেশি পর্যটনে ভাটা পড়েছে। তবে দেশের ভেতরে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় হতে পারে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব), অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ (আটাব), প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ, ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, কক্সবাজার কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সদস্য ও ট্রাভেল এজেন্টদের সবার কণ্ঠেই হতাশার সুর। কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে কথা বলেও অভিন্ন কথাই শুনতে হলো।

তৌফিক রহমান, প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিববিদেশি না এলে পর্যটন এগোবে না। দেড় বছর ধরে বিদেশি পর্যটক কমছে। জাপান ছাড়া অন্যরা ভ্রমণসতর্কতা এখনো তোলেনি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। সরকার অগ্রাধিকার না দিলে এ খাত এগোবে না।

টোয়াব সদস্যরা বলছেন, বিদেশি পর্যটক আসার ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা তৈরি করে ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে হামলা। এরপর পরিস্থিতির একটু উন্নতি হলে দেখা দেয় ২০২০ সালের বৈশ্বিক অতিমারি করোনা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৪ সালের শুরুতে নির্বাচন নিয়েও নানা শঙ্কা তৈরি হয়। এরপর জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী দেড় বছরে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, নিয়মিত ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। বাংলাদেশে বেড়ানোর ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু দেশে পর্যটন–সতর্কতা রয়ে গেছে। বিদেশে যেতেও খরচ বেশি, ভিসা পাওয়া যায় না।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশে যেতে নানা বাধার কারণেই দেশের ভেতরে এবার আগ্রহ দেখাচ্ছেন পর্যটকেরা। মূলত ঈদের পরদিন থেকে বেড়াতে যাওয়া শুরু করবেন পর্যটকেরা। তবে বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাই কেউ কেউ ভ্রমণের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন।

পর্যটন খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ টোয়াব সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি পর্যটক আসার হার টানা কমছে। এ মাসেই ইতালি থেকে ছোট কয়েকটি দল আসার কথা। মিলান থেকে দুবাই হয়ে ফ্লাইট ছিল। যুদ্ধের কারণে বাতিল হয়ে গেছে। এ ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন, ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা বলা যায়। পর্যটন খাত তলানিতে।

এবারের ঈদে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি। এরপর দুই দিন অফিস করার পর আবার টানা তিন দিনের ছুটি। তাই দুই দফায় বেড়ানোর সুযোগ আছে। আবার কেউ কেউ দুই দিন ছুটি নিয়ে টানা ১২ দিনের জন্য বেড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন।

ভিসা জটিলতা, ফ্লাইট টিকিট চড়া

প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বেড়াতে যান ঢাকার ফারজানা নীলা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে ঘুরে বেড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এখান থেকে বেড়ানোর খরচ শুধু বাড়ছে। হাতে গোনা কয়েকটি দেশে ভিসা পাওয়া যায়, যেখানে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম বেশ চড়া। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর কারণে টিকিটের দাম আরও বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে এবারের ছুটিতে বেড়ানোর পরিকল্পনা করা যায়নি।

ঈদের ছুটিতে শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে যাচ্ছেন রাশেদ নিজাম। তিনি বলেন, মাত্র তিন ঘণ্টা দূরত্বের ফ্লাইটের টিকিট ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হয়ে গেছে। বহু খোঁজাখুঁজি করে ভারতের ট্রানজিট নিয়ে ৬০ হাজার টাকায় টিকিট করেছেন তিনি। যুদ্ধ শুরুর আগেই টিকিট করা হয়েছে। এরপর আরও বেড়ে গেছে।

মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান, টোয়াবের সভাপতিপর্যটনের জন্য অনুকূল পরিবেশ লাগে, এখন তা নেই। যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে গন্তব্য কমে গেছে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আছে। তাই বিদেশ থেকে পর্যটক আসা ও বিদেশে যাওয়ায় তেমন সাড়া নেই এবার। দেশের মধ্যে পর্যটন এলাকায় ভিড় হবে।

এবারের ঈদে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি। এরপর দুই দিন অফিস করার পর আবার টানা তিন দিনের ছুটি। তাই দুই দফায় বেড়ানোর সুযোগ আছে। আবার কেউ কেউ দুই দিন ছুটি নিয়ে টানা ১২ দিনের জন্য বেড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন। তবে বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসার সীমাবদ্ধতা আছে। সবচেয়ে বেশি পর্যটক যান প্রতিবেশী দেশ ভারতে। দেশটির ভিসা বন্ধ দেড় বছর ধরে। থাইল্যান্ডেও ভিসা পেতে সময় লাগছে। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, উজবেকিস্তান মাঝে জনপ্রিয় হয়েছিল। ভিসা জটিলতায় এখন এসব দেশে তেমন পর্যটক যাচ্ছেন না। শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ এখন জনপ্রিয় গন্তব্য। ঈদে এসব দেশের ফ্লাইটের টিকিটের দাম তিন গুণ হয়ে গেছে।

টোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটনের জন্য অনুকূল পরিবেশ লাগে, এখন তা নেই। যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে গন্তব্য কমে গেছে, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আছে। তাই বিদেশ থেকে পর্যটক আসা ও বিদেশে যাওয়ায় তেমন সাড়া নেই এবার। দেশের মধ্যে পর্যটন এলাকায় ভিড় হবে। যদিও দেশে অধিকাংশ পর্যটক নিজেদের মতো ঘুরে বেড়ান, ট্রাভেল এজেন্সির কাছে আসেন না।

এবারও ঈদের ছুটিতে আগ্রহের কেন্দ্রে আছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়ি জনপদের তিন পার্বত্য জেলা এবং চায়ের দেশ সিলেট ও মৌলভীবাজার।

আগ্রহের কেন্দ্রে পাহাড় সমুদ্র চা–বাগান

দেশে ভ্রমণপ্রিয় মানুষের অন্যতম পছন্দের জায়গা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। এবার ঈদে লম্বা ছুটিতে ভালো ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন কক্সবাজারের হোটেল–মালিকেরা। সম্প্রতি কক্সবাজারের কলাতলি সমুদ্রসৈকতে

এবারও ঈদের ছুটিতে দেশের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোতে যেতে আগাম বুকিং নিচ্ছেন আগ্রহীরা। আগ্রহের কেন্দ্রে আছে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, পাহাড়ি জনপদের তিন পার্বত্য জেলা এবং চায়ের দেশ সিলেট ও মৌলভীবাজার। এর বাইরে সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর ও নদীপথে বিভিন্ন জাহাজে কয়েকটি রুটে ভ্রমণের প্যাকেজ বুকিং করেছেন কেউ কেউ। এবারও উপচে পড়া ভিড় হতে পারে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে।

কক্সবাজারে সাড়ে চার শর বেশি হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট আছে। হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতি কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের পরদিন থেকে পরবর্তী পাঁচ দিনের বুকিং হচ্ছে। থ্রি স্টার, ফাইভ স্টার মানের হোটেলে ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে। এর বাইরে অন্যান্য হোটেলের বুকিং ৫০ শতাংশ পার হয়েছে। পাঁচ থেকে সাত লাখ পর্যটক এবার আসতে পারেন বলে আশা করেন তিনি।

ঘন নীল পাহাড়, সাদা মেঘ, ঝিরি-ঝরনা আর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দেখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছুটে যাচ্ছেন অনেকে। প্রতিবছরের মতো এবারও পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পর্যটকদের ভিড় হবে। ইতিমধ্যে এসব জেলার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ হোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছেন পর্যটকেরা। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে মোটরসাইকেল অভিযাত্রীরা এবার তেমন বুকিং দিচ্ছেন না। বগা লেকের কুটির মালিক লালকিম বম প্রথম আলোকে বলেন, ১৯ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কুটিরে বুকিং রয়েছে। কিন্তু তেলের সংকটে পানি সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভালো ব্যবসার আশা হোটেল–রিসোর্টে, নানা প্যাকেজ বিনোদনকেন্দ্রে

খাগড়াছড়ি হয়ে প্রতিদিনই বহু পর্যটক যাতায়াত করেন সাজেক ভ্যালি। সাজেক কাউন্টারের লাইনম্যান সৈকত চাকমা বলেন, ‘গতকাল সাজেকের উদ্দেশে ৪০টি গাড়ি ছেড়ে গেছে। শুক্র ও শনিবারের জন্য সব গাড়ি আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ঈদের পরদিন থেকে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।’ রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ রুম বুকিং হয়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি পর্যটকের সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি পর্যটক না এলে পর্যটন এগোবে না। দেড় বছর ধরে বিদেশি পর্যটক কমছে। জাপান ছাড়া অন্যরা ভ্রমণসতর্কতা এখনো তোলেনি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। সরকার অগ্রাধিকার না দিলে এ খাত এগোবে না।

Read full story at source