বড় ঝুঁকিতে দেশের ৫৮০ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান

· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে এই বাজারে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠান পণ্য রপ্তানি করে। দুই সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ থাকায় এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে এসব রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় আট দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এসব পণ্য রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশই এই আট দেশে গেছে।

Visit amunra.help for more information.

রপ্তানিকারক ও গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের অনেক রপ্তানিকারক প্রথমে প্রতিবেশী ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে পণ্য পাঠিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে তাদের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার। এরপর সক্ষমতা আরও বাড়লে তারা ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বাজারে প্রবেশ করেন। গত বছর ভারতের বিধিনিষেধে ছোট রপ্তানিকারকেরা একবার বড় ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট তাদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য রপ্তানিতে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপের মতো কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী থাকলেও বাকিদের বেশির ভাগই ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠান। অনেক বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকও এই বাজারে সক্রিয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায় ইরান। সংঘাত দ্রুত পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। ফলে সমুদ্রপথে কার্যত রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ইরানসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবের বড় অংশে সমুদ্রপথে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। হরমুজের কাছাকাছি থাকা ওমানেও পণ্য পাঠানো বন্ধ।

সমুদ্রপথে রপ্তানি বন্ধ থাকলেও সীমিত পরিসরে বিমানপথে কিছু পণ্য যাচ্ছে। তবে এই আট দেশে মোট রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ যায় উড়োজাহাজে। বাকি ৮১ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়, যা এখন প্রায় বন্ধ।

ঝুঁকিতে ৫৮০ রপ্তানি প্রতিষ্ঠান

এনবিআরের হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক ও তৈরি পোশাকবিহীন দুই ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। গত অর্থবছরে ওই অঞ্চলে তৈরি পোশাক ছাড়া ৪৯৩ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়েছে (আট ডিজিটের এইচএস কোড অনুযায়ী)। এর মধ্যে প্রধান পণ্য ছিল পাটজাত পণ্য, বিস্কুট ও পানীয়সহ খাদ্যপণ্য, সবজি, মসলা, পানপাতা, তামাক ও জুতা।

মসলা ও বিস্কুট এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্য। গত অর্থবছরে এই দুই পণ্যের রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলারের। ঢাকার আমিনবাজারের ওয়েলকাম ইমপেক্স ফুড অ্যান্ড বেভারেজ চার বছর ধরে সৌদি আরবে এই পণ্য রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় প্রায় ৩০ জন কর্মী কাজ করেন। গত অর্থবছরে তারা প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

* মোট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান: ১৮২৩টি* মোট রপ্তানি: ৭৫ কোটি ডলার* রপ্তানির বড় অংশই পারস্য অঞ্চলনির্ভর: ৫৮০টি প্রতিষ্ঠান* ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি: ২৯.২৭ কোটি ডলার

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, যুদ্ধের কারণে রপ্তানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় উৎপাদনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্থায়ী কর্মীদের ছুটিও দেওয়া হয়েছে। এখন নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা চলছে, তবে যুদ্ধের প্রভাব অনেক বাজারেই পড়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রপ্তানির আরেকটি বড় পণ্য সবজি। গত অর্থবছরে এই অঞ্চলে প্রায় তিন কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে। আলী বেভারেজ অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে সবজি, পান ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে।

প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার মোহাম্মদ ইউনূস সরকার বলেন, যুদ্ধের মধ্যেও কিছু পণ্য পাঠানো যাচ্ছে। কারণ, জেদ্দা ও মদিনায় বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে। আগে বিমানে প্রতি কেজি পণ্য পাঠাতে ১০৭ টাকা লাগলেও এখন প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হচ্ছে। সমুদ্রপথে প্রতি কনটেইনারের ভাড়া আগে ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ ডলার, যা এখন বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে হিমায়িত মৎস্য রপ্তানি করে চট্টগ্রামের প্যাসিফিক সি ফুডস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দোদুল কুমার দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের রপ্তানির সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। যুদ্ধের পর সৌদিতে রপ্তানি হলেও জাহাজভাড়া প্রতি কনটেইনারে এক হাজার ডলার বেড়েছে। আবার উড়োজাহাজে রপ্তানির সুযোগ নেই। তাই কার্যাদেশ থাকলেও সেভাবে রপ্তানি করতে পারছি না।’

মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হওয়া আরেকটি হলো পাটজাত পণ্য। গত অর্থবছরে প্রায় চার কোটি ডলারের পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে এই অঞ্চলে। ভারতের বিধিনিষেধের পর অনেক রপ্তানিকারক মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের দিকে ঝুঁকছিলেন। বর্তমান সংকটে সেই সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

পাটজাতীয় পণ্যের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কোয়ালিটি জুট ইয়ার্নের মোট রপ্তানির ৪৭ শতাংশ পারস্য উপসাগর অঞ্চলে রপ্তানি করে আসছে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মালেক প্রথম আলোকে জানান, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও ফেনীতে তাদের তিন পাটকলে পাঁচ হাজার লোক কর্মরত। মূলত ইরান (দুবাই হয়ে যেত), তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার কার্পেটের সুতা রপ্তানি করে আসছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের পাশাপাশি সব দেশেই রপ্তানি বন্ধ। কারণ, জাহাজভাড়া বেড়ে গেছে। তুরস্কে আগে প্রতি কনটেইনারে ভাড়া ছিল ২ হাজার ২০০ ডলার। এখন বেড়ে হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার ডলার। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে।

তৈরি পোশাকও রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ১ হাজার ১৪১টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানি ছিল প্রায় ৪১ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির অর্ধেকের বেশি ওই অঞ্চলে গেছে।

ঢাকার জোয়ার সাহারা এলাকার ইউনিভার্সাল অ্যাপারেলস দুই বছর ধরে সৌদি আরবে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। তাদের দুই লাইনের কারখানায় ৫৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। সৌদিতে তারা বাচ্চাদের প্যান্ট ও লেডিস সেট রপ্তানি করে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মো. আক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার ইউনিভার্সেল অ্যাপারেলসের কোনো শিপমেন্ট ছিল না। আগামী মাসে শিপমেন্ট আছে। তার মধ্যে যুদ্ধ শেষ না হলে পণ্য রপ্তানি হবে না। ফলে আমরা বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। দুশ্চিন্তার বড় কারণ আমাদের কারখানার রপ্তানির পুরোটাই সৌদিতে।

বাজার সম্প্রসারণে সাময়িক ছেদ

জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের সাতটি দেশ ২০২৪ সালে প্রায় ৮৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলক কম হলেও এই বাজারে সম্প্রসারণের বড় সুযোগ রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য একটি সম্প্রসারণশীল বাজার। প্রবাসীদের পাশাপাশি সেখানকার স্থানীয় ভোক্তাদের চাহিদা লক্ষ্য করেও বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি বাড়ছিল। যুদ্ধের কারণে এই বাজারে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ হলে বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর যে সম্ভাবনা ছিল, তা আবারও সামনে আসবে।

Read full story at source