ইরানে ট্রাম্পের হামলার পরিকল্পনা বহু মাস ধরেই চলছিল

· Prothom Alo

ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে ইরানের ওপর যে হামলা চালানো হয়েছে, তার পরিকল্পনা বহু মাস ধরেই চলছিল। কিন্তু মার্কিন-ইরান আলোচনার মাঝপথে এই আঘাত হানার সময় বেছে নেওয়াটা আবারও প্রশ্ন তুলবে—ওয়াশিংটন আদৌ কি তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আন্তরিক ছিল?

গত বছরের জুনে ষষ্ঠ দফা বৈঠকে বসার নির্ধারিত সময়ের মাত্র তিন দিন আগে, ইসরায়েল (পরে আমেরিকাকে সঙ্গে নিয়ে) ইরানের বিরুদ্ধে ১০ দিনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিল।

Visit een-wit.pl for more information.

অতএব, দ্বিতীয় দফা আলোচনার মাঝখানে এই হামলা কার্যত ইরানি শাসকদের কাছে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন আলোচনার প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার সম্ভাবনাই ভেঙে দিল। তারা ইতিমধ্যে দুবার ‘দগ্ধ’ হয়েছে। একটি ইরানি টেলিগ্রাম চ্যানেলে যেমন লেখা হয়েছে, আবারও কূটনীতির পথে এগোতে গিয়েই আমেরিকার হামলার মুখে পড়ল ইরান। আবারও প্রমাণিত হলো, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র আমেরিকার সঙ্গে কূটনীতি ফলপ্রসূ নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি খুব ভালো করেই জানতেন, ট্রাম্প যেকোনো সময় কূটনীতির পথ পরিহার করতে পারেন। তবু তাঁর মনে হয়েছিল,
ঝুঁকিটা নেওয়া উচিত; ট্রাম্পকেই আগে হামলা চালাতে দেওয়া উচিত।

আমেরিকার পরিকল্পনা এবং আসন্ন সামরিক হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হয়েই আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি হঠাৎ করে ওয়াশিংটনে ছুটে যান। আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক বলে তুলে ধরতে এক মরিয়া প্রচেষ্টা চালান তিনি। এমনকি অস্বাভাবিক পদক্ষেপ হিসেবে সিবিএসে উপস্থিত হয়ে গড়ে ওঠা চুক্তির বহু গোপন দিকও প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শান্তিচুক্তি হাতের নাগালে আছে।

কিন্তু আলবুসাইদিকে কেবল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি ভ্যান্সকেও বোঝানোর চেষ্টা করেন, আলোচনা সাফল্যের দোরগোড়ায়।

২০১৫ সালের যে চুক্তি থেকে ট্রাম্প ২০১৮ সালে সরে এসেছিলেন, তার তুলনায় এই সমঝোতা অনেক উন্নত হবে বলেও দাবি করেন তিনি।

ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বরাবরই এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পক্ষে সওয়াল করেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটি কতটা অসুরক্ষিত ছিল, সে কথাই তিনি বারবার উল্লেখ করতেন। তাঁর যুক্তি ছিল, আমেরিকা যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে, তবে ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রয়োজনও কমে যাবে।

এই আলোচনা বা সময়সূচি কোনোটাই ট্রাম্পের পছন্দ ছিল না। তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—ট্রাম্প আসলে চেয়েছিলেন ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করুক। ইরান তা না করায় তিনি নাকি অবাক হয়েছেন।

হামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হয়েছিলেন বা কোথায় মতভেদ ছিল, সে সব নিয়ে কিছুই বলেননি। শুধু বলেছেন—ইরানের কর্মকাণ্ড আমেরিকা, বিদেশে থাকা মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি এবং মিত্রদেশগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এখন আমেরিকার ভেতরে বিতর্ক উঠবে—ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবুসাইদি যে বলেছিলেন আলোচনা এগোচ্ছিল, তা কতটা সত্যি। যদি সত্যিই ইরান কম
মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে রাজি হয়ে থাকে, বেশি মাত্রার মজুত তুলে দিতে চায় এবং আন্তর্জাতিক তদারকিতে সম্মত হয়ে থাকে, তাহলে তো ইরানের বোমা বানানোর পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেত। সে ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠবে—ট্রাম্প ইচ্ছা করেই এমন একটি চুক্তি নাকচ করেছেন, যা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে পারত। অন্যরা হয়তো বলবেন—ইরানের কঠোর ও দমনমূলক শাসনই নিজে একটি বড় হুমকি, তাই শুধু পারমাণবিক চুক্তি যথেষ্ট নয়।

তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, হামলার আগে ট্রাম্প ঠিক কী করতে চাইছেন এবং কেন করতে চাইছেন, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ, কংগ্রেস বা মিত্রদেশগুলোর কাছে পরিষ্কার করার কোনো চেষ্টা করেননি।

ইরানের দৃষ্টিভঙ্গিতে, ১ হাজার ২৫০ মাইল (২,০০০ কিলোমিটার) পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সঙ্গে আলোচনায় তোলা যেতে পারে। কিন্তু নীতিগতভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র তাদের প্রতিরক্ষার অংশ এবং সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলাই দেখিয়ে দিয়েছে যে এগুলো ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় উপাদান।

ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বরাবরই এই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পক্ষে সওয়াল করেছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটি কতটা অসুরক্ষিত ছিল, সে কথাই তিনি বারবার উল্লেখ করতেন। তাঁর যুক্তি ছিল, আমেরিকা যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে, তবে ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রয়োজনও কমে যাবে।

অন্য পক্ষের যুক্তি হবে, অনুতাপহীন ও দমনমূলক ইরানি শাসনের অব্যাহত অস্তিত্বই বিশ্বনিরাপত্তার পক্ষে এক হুমকি; সুতরাং এই হামলার সিদ্ধান্ত ঠিকই আছে।

তবে যে ব্যাখ্যাই ধরা হোক, বিস্ময়কর এই যে হামলার আগে ট্রাম্প আমেরিকান জনগণ, কংগ্রেস বা তাঁর মিত্রদের কাছে তাঁর পদক্ষেপ কিংবা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করার প্রায় কোনো চেষ্টাই করেননি।

  • প্যাট্রিক উইন্টুর দ্য গার্ডিয়ান-এর কূটনৈতিক সম্পাদক

  • দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

Read full story at source