নদীভাঙন ও বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদ জামালপুর

· Prothom Alo

  • যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় চরের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা প্রায় পৌঁছেই না। 

  • বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা নিয়মিত টিকা ও জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

    Visit zeppelin.cool for more information.

  • বন্যায় কৃষকেরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকেই ঢাকা বা অন্য শহরে নিম্ন আয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

  • দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থার কারণে বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষক জেলা শহরে থাকেন। ক্লাস চলে প্রক্সি শিক্ষক ও দপ্তরি দিয়ে। 

  • নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের অভাব এবং ১৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। 

  • সমন্বিত মহাপরিকল্পনা না থাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন মানুষের কোনো সরাসরি উপকারে আসছে না।

জামালপুর জেলার বেশির ভাগ এলাকা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীসংলগ্ন। প্রতিবছর নদীভাঙন, বন্যায় ঘরবাড়িসহ সবকিছু হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয় হাজারো মানুষ। একদিকে দুর্যোগ আর অন্যদিকে কর্মসংস্থান না থাকায় মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এসব মানুষের না আছে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা, না আছে শিক্ষার আলো। বসতভিটাসহ স্কুলভবন নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় অকালে ঝরে পড়ছে বহু শিক্ষার্থী। সরকারের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়নের ছোঁয়াও সেভাবে লাগে না জামালপুরে। যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীতে প্রতিবছর বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দেয়। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ–নদীবেষ্টিত এলাকার বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন। অন্যদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।

ব্রহ্মপুত্র ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, যমুনা, ঝিনাই, দশানী, জিঞ্জিরাম, আলাই ও মরা জিঞ্জিরাম নদ–নদী প্রবাহিত হয়েছে জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে। নদ–নদীগুলোর মধ্যে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে বন্যা ও ভাঙন প্রতিবছরের চিত্র। নদীর কারণে জেলায় অসংখ্য চর রয়েছে।

যমুনার বুকে জেগে ওঠা জামালপুর অংশের চরগুলো হলো ইসলামপুর উপজেলার জিগাতলা, সিন্ধুরতলী, শিলদহ, মন্নিয়া, বরুল, চর বরুল, চেঙ্গানিয়া, কাসারিডোবা, চর শিশুয়া, ইনডুলেমারী, কোদালধোয়া, মণ্ডলপাড়া, প্রজাপতি, বিশরশি, সাপধরি ও বীরনন্দনের পাড়া, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার টিনেরচর, মাদারগঞ্জ উপজেলার পাকরুল, আতামারি ও হিদাগাড়ি চর এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার নলসন্ধ্যা চর। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় কয়েকটি চর রয়েছে।

এসব চরে নদীভাঙনের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে রয়েছে খরার প্রকোপ। মৌলিক নাগরিক সুযোগ–সুবিধা থেকে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর। আর স্বাস্থ্যসেবা তাঁদের কাছে একপ্রকার দুর্লভ। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত নানা রোগব্যাধির সম্মুখীন হলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

বন্যার হানা

প্রতিবছর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ও টানা বৃষ্টিতে জামালপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিস্তীর্ণ জনপদ, সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ফসল। বন্যার সময় কয়েক সপ্তাহ ধরে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় থাকেন।

২০২০ সালে জামালপুরে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় হয়। জেলার ৭৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। কয়েকটি জায়গায় সড়কের সঙ্গে রেলযোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে লাখো মানুষ। দীর্ঘ সময় পানি থাকায় দেখা দিয়েছিল মানুষ ও গবাদিপশুর খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের বন্যায় সাতটি উপজেলার ৪৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। একই সঙ্গে চারটি পৌরসভাও বন্যাকবলিত হয়। ওই ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৪৯০টি গ্রামের ৫ লাখ ৯৮ হাজার ২১৭ জন মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিল। বন্যায় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ২৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৫ হাজার ৪৯২ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছিল, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

নদীভাঙনের ফলে একসময়ের জনাকীর্ণ বহু এলাকা এখন শুধুই বালুচর। যমুনা নদী–তীরবর্তী ওই সব চরে শুকনো মৌসুমেও রেহাই নেই। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম পানিপথ শুকিয়ে যাওয়ায় চরের বাসিন্দাদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

জামালপুরের পাঁচটি উপজেলায় নদীভাঙন ও বন্যার তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।

নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষ

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর ডাকাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৬২)। একসময়ের সচ্ছল পরিবারের এই নারী ভাঙনের কবলে পড়ে এখন নিঃস্ব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটা সময় ঘরবাড়ি, জমিজমা, গরু-ছাগলসহ সবই ছিল। সহায়–সম্বল সব গিইল্লা খাইল গাঙ্গে। এই জীবনে ৩০ বার ভিটা ভাঙছে। মনে করছিলাম, এই ভিটাতে মরমু। কিন্তু তা আর অইল না। শেষ বয়সে আইস্যা নতুন কইরা আবার ভিটাহারা অইলাম।’

সম্প্রতি যমুনা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটিসহ অবশিষ্ট জমিজমাও হারান সাত সন্তানের মা রহিমা বেগম। সন্তানদের কাছেই থাকেন তিনি। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, যমুনা নদীর ভাঙনে এক সন্তানের ঘরসহ ভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে বাকি ছয় সন্তানের বসতভিটাও। ভাঙনের একদম কাছেই খোলা আকাশের নিচে তাঁর এক পুত্রবধূ দুপুরের রান্না করছিলেন। অন্য স্বজনেরা ঘরবাড়ি সরাতে ব্যস্ত। নদীর তীর থেকে কিছুক্ষণ পরপর ভাঙনের শব্দ কানে ভেসে আসছিল। এই পরিবারের মতোই অবস্থা পাঁচটি উপজেলার নদী–তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের।

সম্প্রতি মাদারগঞ্জের পাকরুলের তেঘরিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, মানুষ নদীসংলগ্ন বাড়িঘর স্থানান্তরে ব্যস্ত। এমনই একজন কেয়াফুল নামের এক সত্তরোর্ধ্ব নারী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই যে দেখতাছেন নদীডার কিনার, ওইখানে আমার বাড়িডা আছিলো। পুলাপানও দেখে না আমারে, অহন বাড়িডাও গেল নদীতে। কই যামু, কী খামু, এই বয়সে কার কাছে হাত পাতমু জানি না।’

কয়েক যুগে বিলীন হয়ে গেছে ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলার নদীতীরের ১৫টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রামের ফসলি জমি ও ভিটেমাটি। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবার। নদীগর্ভে চলে গেছে প্রাচীন বাজার, রাস্তাঘাট, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভাঙনের শিকার হয়েছে প্রায় অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি যমুনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর ডাকাতিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাকা ভবন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বহুদিন ধরে ভাঙন চললেও গত বছর ২৮ মার্চ থেকে ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করে। নদীর ভাঙনে বিদ্যালয়টির আশপাশে অর্ধশত বসতঘর ও বিস্তীর্ণ জনপথ বিলীন হয়ে গেছে। ডাকাতিয়াপাড়ার একমাত্র বিদ্যালয় ছিল এটি। ভাঙনের কারণে সেটিও রইল না।

স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ি থেকে চর ডাকাতিয়া হয়ে বড়খাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। ওই অংশের মধ্যে খোলাবাড়ি, হাজারী, মাগুরিহাট, চর মাগুরিহাট, খানপাড়া, মাঝিপাড়া, ডাকাতিয়া গুচ্ছগ্রাম, চর ডাকাতিয়া ও চর ডাকাতিয়াপাড়া গ্রামের কয়েক হাজার বসতভিটা ও শত শত একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। মাঝেমধ্যে কয়েকটি স্থানে পাউবো শুধু তীব্র ভাঙনের সময় কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ওই সব গ্রামের অবশিষ্ট বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চর ডাকাতিয়াপাড়া এলাকার শিক্ষার্থী শোয়েব হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগেও তাঁদের বাড়ি থেকে নদী প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল। গত ২৯ মার্চ তাঁদের বসতভিটা ভেঙে গেছে। এখন বর্ষাকালে তাঁদের বসতভিটার ওপর দিয়ে নদীর স্রোত বয়ে যায়। আগের চেয়ে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাই বাকিদের বসতভিটাও যেকোনো সময় ভেঙে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে।

সত্তর ছুঁই ছুঁই কেয়া মনি দেখাচ্ছেন যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে কীভাবে তাঁর শেষ সম্বল ঘর চোখের পলকে নদীগর্ভে চলে গেছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার তেঘরিয়া বাজারে

জলবায়ু পরিবর্তনে তীব্র হচ্ছে ভাঙন

যুক্তরাজ্যের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার (আইআইইডি) জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা দলের প্রধান ও মুখ্য গবেষক ঋতু ভরদ্বজ প্রথম আলোকে বলেন, নদীভাঙনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়া এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে—কখনো হঠাৎ অতিবৃষ্টি, কখনো নদীর তীব্র স্রোত, শক্তিশালী জোয়ারের ঢেউ এবং এরপর দীর্ঘ অনাবৃষ্টির ফলে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এগুলো সবই নদীর পাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে যখন বড় কোনো বন্যা বা জলোচ্ছ্বাস আসে, তখন পাড়গুলো অনায়াসেই ধসে যায়। মানুষ ঘর বাঁধে, নতুন করে জীবন শুরু করে এবং এরপর আবার সবকিছু হারায়। যা আগে কয়েক দশকব্যাপী ধীরে ধীরে ঘটত, এখন তা মাত্র কয়েক ঋতুর মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে। সুতরাং জলবায়ু পরিবর্তন যে শুধু নদীভাঙন তৈরি করছে, তা নয়, বরং এটি ভাঙনের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং নদীপাড়ের পরিবারগুলোর জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, নদীভাঙনের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে এবং বৃষ্টিপাতের অনুপাত কম বেশি হয়। যেমন গত বছর দার্জিলিং এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই পানি বাংলাদেশে ঢোকার আগে আমাদের এখানে নদীর পানি নেমে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ পানি বেড়ে বন্যার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এতে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে নদীভাঙন সৃষ্টি করেছে। কারণ, হঠাৎ করে পানি এলে নদী তো আর রাতারাতি চওড়া হচ্ছে না, কিছুটা গভীর হয়। তখন অবধারিতভাবে নদীর দুই পাড় ভাঙে।

 আইনুন নিশাত আরও বলেন, পাহাড়ি নদীর পানি পাড় উপচে দ্রুত প্লাবনভূমিতে ঢোকে। এক দিনে ১০-১৫ ফুট পর্যন্ত পানি বাড়তে পারে, আবার দুই দিনে ১০-১৫ ফুট নিচেও নেমে যেতে পারে। জামালপুরে ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে এক দিনে ২ থেকে ৪ ফুট পানি বাড়ে। প্লাবনভূমি থেকে পানি নামার সময় ভূমির ওপর দিয়ে চুইয়ে নদীতে আসে। যেহেতু নদীর পাড়গুলো আগেই দুর্বল অবস্থায় থাকে, তখন কোনো কারণে নদী ক্ষিপ্ত হলে দ্রুত ভাঙন শুরু হয়। ফলে বন্যার সময় যেমন নদী ভাঙে, বন্যার পর আরও বেশি ভাঙে।

এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আইনুন নিশাত বলেন, নদীভাঙন ঠেকাতে দুই পাড় বাঁধানো থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী যেমন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধানো। ভাঙার যে শক্তি, তার থেকে অতিরিক্ত শক্তি নদীর পাড়ে যদি থাকে, তাহলে নদী ভাঙবে না। কিন্তু এটা ব্যক্তি পর্যায়ে সম্ভব নয়। এ জন্য রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে।

নদীর তীব্র ভাঙন আর গ্রাসে বিলীন হচ্ছে গ্রাম। শেষ চেষ্টা হিসেবে বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। মাদারগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে

বাস্তুচ্যুত মানুষ ঘুরছে দিগ্‌বিদিক

মেঘের গর্জন আর বৃষ্টিতে বাড়ির বারান্দায় মুখ বেজার করে বসে ছিলেন মো. আনার উদ্দিন। তাঁর বাড়ি মাদারঞ্জের তেঘরিয়া বাজারে। তাঁর ছেলে আবদুল আলীম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। একদিকে ফসল উৎপাদন কমে উপার্জন কমে গেছে। অন্যদিকে মাসে মাসে ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচের টাকা পাঠানোর দুশ্চিন্তা। সম্প্রতি আনার উদ্দিনের বাড়ি গেলে তিনি বলেন, যেভাবে ভাঙছে তাতে তাঁর বাড়িসহ ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যাবে। ছেলেকে কীভাবে টাকা পাঠাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় তাঁর ঘুম আসে না। ২০ দিন পর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে আনারের ছেলে আবদুল আলীম বলেন, তাঁদের বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন। আবার নতুন করে সব শুরু করতে হচ্ছে।

প্রায় এক দশক আগে জামালপুর ছেড়েছিলেন আকমল হোসেন। তিনি এখন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় কিছু কৃষিজমিতে আবাদ করেন আর হাঁড়িপাতিলের ব্যবসা করেন। আকমল বলেন, ছোটবেলা থেকেই বন্যা আর নদীভাঙন দেখছেন। সন্তানের পড়াশোনার কথা চিন্তা করে রংপুরে পাড়ি জমান। তিনি বলেন, ‘নিজের এলাকার লাইগ্যা মনডা কান্দে। যাই মাঝেমধ্যে। যতই হউক আমার জন্মভূমি তো আর অস্বীকার করবার পারি না।’

জামালপুরের পাঁচটি উপজেলায় কমবেশি নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। কৃষক, জেলে এবং পেশাজীবী মানুষ তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ও
পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। আত্মপরিচয়টুকুও হারিয়ে সংজ্ঞায়িত হচ্ছেন বাস্তুচ্যুত হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কয়েক যুগে জেলায় কত হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

স্থানীয় লোকজনের মতে, ১৯৬৯ সাল থেকে এই জেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদী–তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই শুকনো ও বর্ষা মৌসুমে পাঁচটি উপজেলার নদী–তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ভাঙন চলে। দেওয়ানগঞ্জের খোলাবাড়ি থেকে সরিষাবাড়ী উপজেলার পিংনা পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার যমুনার ভাঙনপ্রবণ এলাকা। একইভাবে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন হয়। প্রতিবছর ওই দুটি নদীর ভাঙনে কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। কয়েক যুগ ধরে নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন হাজারো মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেকে গেছেন ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে। আর যাঁরা রয়ে গেছেন, তাঁরা অন্যের জমিতে বসতঘর নির্মাণ করে থাকছেন।

ঢাকার আশুলিয়ায় সম্প্রতি কথা হয় আমেনা ও আলমগীর দম্পতির সঙ্গে। তাঁরা পাঁচ বছর আগে এখানে এসে বস্তিতে থাকা শুরু করেছেন। আলমগীর কিছুদিন পোশাক কারখানায় কাজ করেছিলেন। চাকরি হারিয়ে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। অন্যদিকে আমেনা পোশাককর্মীদের মেসে রান্নার কাজ করেন। আলমগীর বলেন, ‘এলাকায় তো বাড়ি নাই, নদীতে গেছে গা। থাকমু যে সেই জমিও নাই। পরে ঢাকা আইলাম। কাম করি, খাই। বাচ্চাডা ক্লাস টুতে পড়ে। আর তো এলাকায় গিয়া লাভও নাই। কামও পাওয়া যায় না সেভাবে।’

এই নারী নদীর পাশে খাওয়ার পানি খুঁজতে বেরিয়েছেন। অথচ কয়েক দিন আগেও নিজের বাড়ির নলকূপের পানি খেয়েছেন

স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত

একসময়ের জনাকীর্ণ এলাকা বন্যা ও ভাঙনের কারণে এখন ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি ও পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। আর বর্ষা মৌসুমে নৌকায় চলাচল করতে হয়। বর্ষার চেয়ে শুকনো মৌসুমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন চরের বাসিন্দারা। চরগুলোয় কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু যাতায়াতব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকেরা থাকতে চান না। আবার রোগীরাও যানবাহনের অভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারেন না। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন পড়লেও সহজে হাসপাতালে যাওয়ার উপায় নেই চরের এসব মানুষের। বৃদ্ধ ও শিশুর পাশাপাশি সবচেয়ে ভুক্তভোগী গর্ভবতী নারীরা।

ইসলামপুর উপজেলার মন্নিয়া চরের বাসিন্দা মো. ইবরাহিম বলেন, এসব চরে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীর পা পড়ে না। গর্ভবতী নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। চরগুলোয় জন্মহারও বেশি। পরিবার পরিকল্পনা কি তাঁরা অনেকেই জানেন না। প্রতিটি পরিবারে চার–পাঁচজন করে সন্তান। নবজাতক বা শিশুদের নিয়মিত প্রতিষেধক টিকাও দেওয়া হয় না। নেই কোনো ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। গ্রামের মানুষের শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা গ্রামের মসজিদের ইমাম।

অন্যদিকে নিকটতম স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রগুলোও প্রায়ই চরাঞ্চল থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। অনেক সময় নদী পার হয়ে উপজেলা শহরের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পৌঁছায় না শিক্ষার আলো

গত বছর বন্যার কারণে জামালপুরে ৩৬৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িও ডুবে যায়। অনেকে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। ফলে আর স্কুলে ফেরা হয় না এ শিশুদের।

স্থানীয় লোকজন জানান, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের কারণে নদীভাঙন, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় চরাঞ্চলের মানুষের। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে খরার কবলে পড়তে হয়। ফলে এসব চরাঞ্চলের হাজারো শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। চরাঞ্চলে বেড়ে ওঠা এসব শিশু জানে না তাদের ভবিষ্যৎ কী।

ইসলামপুর উপজেলার জিগাতলা, সিন্ধুরতলী, শিলদহ, মন্নিয়া, বরুল, চর বরুল, চেঙ্গানিয়া, কাসারিডোবা, চর শিশুয়া, ইনডুলেমারী, কোদালধোয়া, মণ্ডলপাড়া, প্রজাপতি, বিশরশি, সাপধরি ও বীরনন্দনের পাড়া, দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার টিনেরচর ও মাদারগঞ্জ উপজেলার পাকরুল, আতামারি ও হিদাগাড়ি চর এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার নলসন্ধ্যা চরগুলো দুর্গম হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে জানা যায়, এসব চরাঞ্চলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু রয়েছে। যাদের বেশির ভাগই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। স্কুলের পরিবর্তে শিশুদের কর্মস্থলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জেলা শিক্ষা বিভাগ সূত্র জানায়, যমুনার চরাঞ্চলের ২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫টি মাদ্রাসা, ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে।

এসব চরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষক জেলা শহরে থাকেন। তাঁরা স্কুলে তেমন একটা আসেন না। ক্লাস চলে প্রক্সি শিক্ষক ও দপ্তরি দিয়ে। এলাকার অল্পশিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের সামান্য কিছু বেতন দিয়ে এসব বিদ্যালয় কোনোরকমে পরিচালনা করা হচ্ছে। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী তুলনামূলক কম। যারা বিদ্যালয়ে যায়, তারাও সারা দিন খেলাধুলা আর হইহুল্লোড় করে বাড়ি ফিরে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক হওয়ার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা। নদীর তীরঘেঁষা হওয়ায় এসব চর এলাকা অত্যন্ত দুর্গম হিসেবে পরিচিত। নদীভাঙনের ফলে অনেক স্কুল বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদীগর্ভে চলে যায়। ফলে স্কুল আবার নির্মাণ করাসহ স্থানান্তর করতে হয়। তা ছাড়া চরাঞ্চলে রাস্তাঘাট না থাকায় মাইলের পর মাইল শুধু বালুচর। আবার ওই এলাকার বেশির ভাগ পরিবার অসচ্ছলতার কারণে ছেলেমেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেয়ে খেত-খামারে কাজ করাতেই আগ্রহী হচ্ছে।

শেফালী বেগম (৩৮) ছল ছল চোখে তাকাচ্ছিলেন যমুনার দিকে। যেখানে দাঁড়িয়ে ভাঙন দেখছেন, সেই স্থানটিও ভেঙে যায় ছবি তোলার দিনই

নেই কোনো পরিকল্পনা

সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) ২০২২ সালে নির্মাণের পর থেকে খালি পড়ে আছে। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৩১ কোটি টাকার বেশি। লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষকে প্রশিক্ষিত করে জনশক্তিতে রূপান্তর করা। অথচ এ এলাকার মানুষ এ থেকে কোনো সুবিধাই পায়নি। এই উন্নয়নের নামে অপচয়ের সমালোচনা করে স্থানীয় একজন কলেজশিক্ষক বলেন, ‘উন্নয়ন না করে কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে। এই টাকা কার পকেটে ঢুকেছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমরা দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের সরাসরি উপকারে আসে এমন উন্নয়নও চাই। জামালপুর ঘিরে উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।’

নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, সরকারের মহাপরিকল্পনায় অবহেলিত জেলা নেই। থাকলে এতে জামালপুরের অবশ্যই স্থান পাওয়া উচিত। এখানে বড় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল তৈরি, শিক্ষার উন্নয়ন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য টেকসই উন্নয়ন দরকার।

Read full story at source