কক্সবাজারের বড় সুপারিকে কেন আপেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়
· Prothom Alo

কক্সবাজারের ৭১টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ৬৭০ একর জমিতে ছোট বড় ৩১ হাজার ৫৯০টি বাগান রয়েছে। এখানকার সুপারির বাজার প্রায় হাজার কোটি টাকার। আকারে বড় এই সুপারি ক্রেতাদের পছন্দ। এই সুপারে এখন বিদেশেও যাচ্ছে।
উজ্জ্বল কমলা রঙের সুপারিগুলো আকারে বেশ বড়। কষের পরিমাণ কম বলে কাঁচা অবস্থায় স্বাদও ভালো। অনেকে বলে ‘নারকেলি সুপারি’। প্রতিটি কাঁচা সুপারি আকার অনুযায়ী ১০ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি হয়। ভালো দাম পাওয়া যায় বলে বিক্রেতারা এই সুপারিকে ‘আপেল’ বলে সম্বোধন করেন। কক্সবাজার জেলার এই সুপারির খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশের বাইরেও।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় বাগানে এবার সুপারির বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত তিন মৌসুমের চেয়ে ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে চাহিদা বাড়ায় সুপারির দামও বেড়েছে। এ কারণে বাগানিরাও লাভের মুখ দেখছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে টেকনাফ, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়াসহ জেলার ৭১টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ৬৭০ একর জমিতে ছোট বড় ৩১ হাজার ৫৯০টি বাগানে সুপারির চাষ হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সুপারি বিক্রি শুরু হয়েছে। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ইতিমধ্যে ৯৯ শতাংশ গাছ থেকে সুপারি কাটা হয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে সুপারি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, অনুকূল পরিবেশ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করায় অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে সুপারির উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাগানের সংখ্যাও বেড়েছে। বাজারে চাহিদা থাকায় ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাগানমালিক ও চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
অনুকূল পরিবেশ, আধুনিক চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করায় অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে সুপারির উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাগানের সংখ্যাও বেড়েছে। বাজারে চাহিদা থাকায় ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে বাগানমালিক ও চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, এবার প্রতিটি গাছে সুপারি ধরেছে ৪৭০-৫০০টি করে। খুচরা বাজারে মাঝারি আকারের প্রতিটি কাঁচা সুপারি বিক্রি হয়েছে ৮-১০ টাকায়। বড় আকারের সুপারি বিক্রি হয়েছে ১০-১৬ টাকায়। অনেকটা আপেলের দামে সুপারির বিক্রি হওয়ায় চাষিরা খুশি।
আশীষ কুমার বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ৮ হাজার ৬৭০ একরে জমিতে ছোট বড় ৩১ হাজার ৫৯০টি বাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ১২ মেট্রিক টন কাঁচা সুপারি পাওয়া গেছে, যা রোদে শুকিয়ে ১৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন শুকনা সুপারি পাওয়া যাবে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শুকনা সুপারির দাম ৮০০ টাকা। পাইকারিতে প্রতি কেজি ৬০০ টাকা ধরলে ১৪ হাজার ৫০০ টন শুকনা সুপারির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৮৭০ কোটি টাকা। ৪০ হাজার প্রান্তিক চাষিসহ বাগান পরিচর্যা, পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অন্তত দেড় লাখ মানুষ লাভবান হচ্ছেন।
বিক্রির জন্য রাখা সুপারি হাতে এক বিক্রেতাসুপারি চাষে ঝুঁকছে মানুষ
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে প্রচুর সুপারিগাছ রয়েছে। প্রতি মৌসুমে সাবরাং ইউনিয়নেই আড়াই শ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদিত হয় বলে উপজেলা কৃষি অফিসের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। সম্প্রতি গ্রাম ঘুরে বেশ কিছু নতুন বাগানও চোখে পড়েছে।
ইউনিয়নের আছারবুনিয়া গ্রামে ১২ বছর ধরে সুপারি চাষ করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন। এবারও তিনি বাড়ির পেছনে ২ কানি বাগান থেকে সাত লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করেন। বাগানে গাছ আছে ৫১৭টি। প্রতিটি গাছে সুপারি ধরেছে ৪৮০-৫০০টি করে।
আশীষ কুমার, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কক্সবাজারএবার প্রতিটি গাছে সুপারি ধরেছে ৪৭০-৫০০টি করে। খুচরা বাজারে মাঝারি আকারের প্রতিটি কাঁচা সুপারি বিক্রি হয়েছে ৮-১০ টাকায়। বড় আকারের সুপারি বিক্রি হয়েছে ১০-১৬ টাকায়। অনেকটা আপেলের দামে সুপারির বিক্রি হওয়ায় চাষিরা খুশি।দেলোয়ারের দক্ষিণপাশে ৬ কানির সুপারিবাগান করছেন মোহাম্মদ হারুণ। তার পাশে আড়াই কানি জায়গায় বাগান করছেন আবুল কাশেম। তাঁরা জানান, দুজনই বাগান থেকে পাঁচ ও সাত লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করেছেন। সুপারির চাহিদা এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা চড়া মূল্যে সুপারি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। আবুল কাশেম বলেন, আগে মিয়ানমার থেকে শত শত মণ সুপারি আনা হতো। এবার তা বন্ধ আছে।
দেখা গেছে, আছারবুনিয়া, ডেগিল্যারবিল, লেজিরপাড়া, প্যান্ডেলপাড়া, পানছোয়ারি পাড়ার প্রতি বাড়িতেই সুপারি বাগান। চাষিরা গাছের সুপারি কেটে ইজিবাইক, টমটম, ঠেলা ও জিপগাড়িতে ভরে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। টেকনাফের সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ পৌরসভা, বাসস্টেশন, বাহারছড়া, হ্নীলা, উখিয়ার সোনারপাড়া, কোটবাজার, রামুর চৌমুহনীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সুপারি বিক্রির ১৪০টির বেশি বাজার রয়েছে। সপ্তাহের দুই দিন সুপারির হাট বসে। কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে পানের খিলির খাওয়ানোর প্রচলন দীর্ঘদিনের। পানের সঙ্গে সুপারি মিশিয়ে তৈরি হয় পানের খিলি।
উখিয়ার ইনানী সমুদ্র উপকূলের ১০-১৫টি গ্রাম যেন সুপারির গ্রাম। সম্প্রতি এলাকাটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছে শত শত সুপারি ঝুলে আছে। জেলার সর্ববৃহৎ সুপারি বাজার বসে সোনাপাড়া বাজারে। চাষিরা জানান, সপ্তাহের দুই দিন রোববার ও বুধবার সোনারপাড়ার বাজার থেকেই ৬০-৭০ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি হয়। এই বাজারের বেশির ভাগ সুপারি ট্রাকবোঝাই করে কক্সবাজার শহর, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, বগুড়া, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী সরবরাহ হয়।
চাষিরা জানান, গত বছর এক একরের একটি বাগানে সুপারি পাওয়া গেছে ১৮ টনের মতো এবার পাওয়া যাচ্ছে ২০ টনের বেশি। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত মৌসুমে ৮ হাজার ৬৪৫ একরের ৩১ হাজার বাগানে সুপারি উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন, যা বিক্রি করে পাওয়া গেছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। তখন প্রতি একরে সুপারি উৎপাদন হয়েছিল ১৮ দশমিক ৫ মেট্রিক টন করে। এবার উৎপাদন হয়েছে ১৯ দশমিক ৩৫ মেট্রিক টন। কাঁচা সুপারির মধ্যে একটি অংশ শুকনা করা হয়। কিছু অংশ পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। শুকনা ও ভেজা—এই দুই প্রকারের সুপারি বর্ষাকালে দুই গুণ দামে বিক্রি হয়।