নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ার: ক্রসরোডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড!
· Prothom Alo

মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট থেকে বেরিয়ে সিক্সথ অ্যাভেনিউয়ের দিকে সোজা হাঁটতে থাকি। আমরা যাব টাইম স্কয়ারে। গুগল ম্যাপ বলছে, সেভেন্থ অ্যাভেনিউয়ে গিয়ে বাঁয়ে মোড় নিয়ে খানিকটা হাঁটলেই টাইম স্কয়ার। কিন্তু ততক্ষণে পেট চোঁ চোঁ করতে শুরু করেছে। কিছু একটা খেয়ে না নিলে টাইম স্কয়ারের আনন্দ নিরানন্দে রূপান্তরিত হবে যে!
নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুড টেস্ট করবে না? আমার প্রশ্ন খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না সেরীন। আমরা যে রাস্তাটা ধরে হাঁটছি, পাশেই অনেকগুলো স্ট্রিট ফুড ভেন্ডর আছে। প্রতিটি ভেন্ডরের সামনেই মোটামুটি লম্বা লাইন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নিউইয়র্কে আসার আগে ও পরে কতজন যে এই স্ট্রিট ফুড খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন! নতুন খাবারের ব্যাপারে সেরীনের বরাবরই আগ্রহ। নতুন খাবারে আমারই কেবল সমস্যা হয়। কেবল সমস্যা নয়, ভালোই সমস্যা হয়।
ঢাকায় আমাদের বিয়ের পরপর সুযোগ পেলেই আমরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে চলে যেতাম। কখনো দার্জিলিং, কখনো শিলং, কখনো–বা কলকাতা থেকে ট্রেন ধরে দিল্লি, আগ্রা। সড়কপথে খরচ খুবই কম বলে যখন–তখন ঘুরে বেড়ানো যেত। ভারতের একেক অঞ্চলের খাবারের ধরন একেক রকম। যখন যে এলাকায় গিয়েছি, সেরীনের নজর থাকত সেখানকার স্থানীয় স্পেশাল খাবারগুলোর দিকে। আমি খুঁজতাম একেবারে চেনাজানা কী খাবার আছে। সেই সব কথা ভেবেই কি সেরীন স্ট্রিট ফুডের দিকে তাকাচ্ছে না।
আশপাশেই কোথাও ম্যাকডোনাল্ডস আছে। আমি সাইন দেখেছি, সেখানে কিছু একটা খেয়ে নেব, বলেই হাঁটতে থাকে সেরীন। আমরা আরও কয়েকটি স্ট্রিট ফুড ভেন্ডরকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাই। অবশ্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার খাওয়ার মতো অতটা সময়ও আমাদের হাতে নেই।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটানের ব্রডওয়ে ও সেভেনথ অ্যাভিনিউয়ের সংযোগস্থলটাই হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত পর্যটনকেন্দ্র—টাইম স্কয়ারের অবস্থান। উজ্জ্বল বিলবোর্ড, নিয়ন আলোর ঝলকানি, থিয়েটার, কেনাকাটা আর নানা বর্ণের অসংখ্য মানুষের মিলনমেলা—সবকিছু মিলিয়ে টাইম স্কয়ারকে অনেকেই ‘ক্রসরোডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামেও অভিহিত করে থাকেন।
ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, রাস্তায় যেন মানুষের স্রোত। এত ভিড় কেন রাস্তায়! জনস্রোতের সঙ্গে মিশে আমরা সামনে এগোতে থাকি। এখানে–সেখানে জটলা পাকিয়ে অনেক মানুষ কী যেন দেখছে। সেটি কেবল এক জায়গায় নয়, নানা স্থানে। রাস্তার মাঝখানে একটা মঞ্চের মতো কিছু একটা আছে। না, এই মুহূর্তে সেখানে কোনো কিছু হচ্ছে না। কিন্তু মানুষ সেখানেও ভিড় করে আছে। ততক্ষণে আমরা বুঝে যাই, আমরা আসলে টাইম স্কয়ারে পৌঁছে গেছি। আহা! এই সেই টাইম স্কয়ার!
চারপাশে আকাশসমান বিশালাকার আলোঝলমলে বিলবোর্ড চোখ আটকে ফেলে। দিনের বেলার ঝলমলে অবস্থা দেখে আঁচ করা যায়, রাতের বেলায় আলোয় বর্ণিল এই এলাকা কতটা জীবন্ত হয়ে ওঠে! আমরা চোখভরা বিস্ময় নিয়ে টাইম স্কয়ারের বৈচিত্র্য আর বিস্ময়ের ভেতর অবগাহন করতে থাকি।
টাইম স্কয়ারে লেখক ও সেরীন ফেরদৌস২.
টাইম স্কয়ার কিংবা ‘ক্রসরোডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড —যে নামেই ডাকি না কেন, সত্যিই জায়গাটা যেন এক বিস্ময়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে এসে ভিড় জমান, সময় কাটান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটক যেমন আছেন, তেমনি আছেন আমেরিকার বিভিন্ন শহরে বসবাসরত মানুষও। দিনে কিংবা রাতে, যাঁর যখন সুবিধা—পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটে আসেন টাইম স্কয়ারে। যে কারণে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম এক পর্যটনকেন্দ্রে, বিনোদনকেন্দ্রেও। পরিসংখ্যান বলছে, বছরে নাকি ৫০ মিলিয়নের মতো দর্শনার্থী এই টাইম স্কয়ার দেখতে আসেন।
নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টকী দেখেন মানুষ এখানে?
চারপাশে তাকিয়ে দেখি, কী জমকালো পরিবেশ, বিশাল নিয়ন বিলবোর্ড, ও বর্ণিল আলোর ঝলকানি। আর কিছু কি আছে? ইংরেজি নববর্ষের প্রথম প্রহরে টাইম স্কয়ারের ‘বল ড্রপ’ অনুষ্ঠানটি সারা বিশ্বে বিশেষ আগ্রহের। সেটি তো থার্টি ফার্স্ট নাইটের ব্যাপার। কিন্তু প্রতিদিন কেন এত মানুষ ছুটে আসেন টাইম স্কয়ারে! এই প্রশ্ন মাথায় নিয়ে টাইম স্কয়ারে আমরা হাঁটতে থাকি। ততক্ষণে মাথায় এসে ভিড় করে—টাইম স্কয়ারটা এত আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হলো কীভাবে?
সেই ইতিহাসও কিন্তু চমৎকার। শুরুতে সেই ১৮০০-এর দশকের শেষের দিকে এই এলাকার পরিচিতি ছিল ‘লংঅ্যাকর স্কয়ার’ হিসেবে। তখন ঘোড়ায় বহন করে পণ্যসামগ্রী এনে এখানে ব্যবসা পরিচালনা হতো। ক্রমান্বয়ে এলাকায় লোকসমাগম বাড়তে থাকে, তৈরি হতে থাকে বড় বড় অট্টালিকা। ‘লংঅ্যাকর স্কয়ার’ ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে আজকের বহুল আলোচিত ‘টাইম স্কয়ার’–এর।
নিউইয়র্কের সাবওয়েতে‘টাইম স্কয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সঙ্গে দুনিয়া–খ্যাত সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস–এর একটা সম্পর্ক আছে। ১৯০৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রকাশক অ্যাডলফ ওকস পত্রিকাটির অফিস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। এই সময়ে এখানে ২৫ তলার একটি বড় বিল্ডিংয়ের নির্মাণকাজ মাত্র শেষ হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিউইয়র্ক টাইমস–এর অফিস হবে এই বহুতল ভবনে। আগের ৪১ পার্ক রো থেকে নিউইয়র্ক টাইমস–এর অফিস চলে আসে ৪২তম স্ট্রিটের ওয়ান টাইম স্কয়ারের এই ২৫ তলা ভবনে। তখন থেকেই এলাকাটি ‘টাইম স্কয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে। একই বছর টাইমস স্কয়ারে সাবওয়ে স্টেশন চালু হলে এই এলাকার গুরুত্ব বেড়ে যায়। যোগাযোগব্যবস্থা বিশেষ করে সাবওয়ে যোগাযোগের সঙ্গে সঙ্গে এখানে ব্যবসা–বাণিজ্যের বিস্তার ঘটতে থাকে। একই সঙ্গে নানা ধরনের বিনোদনমূলক কাজেরও শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় টাইম স্কয়ার এখন অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে।
টাইম স্কয়ারের ভিড়ের মধ্যে নিজেদের মিশিয়ে দিই আমরা। দুই পাশে বড় বড় বিলবোর্ডে বহুজাতিক কোম্পানির নানা পণ্যের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনগুলোকে মনে হয়, যেন হার্ট থ্রব কোনো মুভির দৃশ্য। পরিবেশের কারণেই কি না, কে জানে, বিজ্ঞাপনের ছবিগুলোও বেশ ভালো লাগতে থাকে। নিয়ন বাতির ঝলকানি যেন কেমন মোহাবিষ্ট করে ফেলে। হাঁটতে হাঁটতে বিশাল একটি বিলবোর্ডের সামনে দাঁড়াই। এটি নাকি বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টারেক্টিভ বিলবোর্ড। ব্রডওয়ে থেকে ৪৫তম ও ৪৬তম স্ট্রিটকে পৃথককারী পুরো ব্লকজুড়ে বিস্তৃত এবং প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ। নিয়ন সাইন আর উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বিজ্ঞাপনে চোখ ঝলসে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াও নাকি শুরু হয়েছে অনেক অনেক বছরে আগে, সেই ১৯২০–এর দশকে। কালের পরিক্রমায় ব্রডওয়ে হয়ে উঠেছে থিয়েটারের কেন্দ্রে।
টাইম স্কয়ারে লেখকঅবশ্য মাঝে খানিকটা খারাপ সময়ও গেছে টাইম স্কয়ারের। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে এলাকাটি অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ে। ফলে নাগরিকদের আগ্রহ হারাতে থাকে। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে তৎকালীন মেয়র রুডি জিউলিয়ানির বিশেষ উদ্যোগ এবং ডিজনি কোম্পানির মতো বড় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের ফলে টাইম স্কয়ার আবার পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পায়।
মানুষ হাঁটছে, আমরা হাঁটছি। এখানে–সেখানে জটলা। কোথাও সার্কাস, কোথাও গানের আসর, টাইম স্কয়ারের স্ট্রিট পারফরমারদের নানা রকম নৈপুণ্য দেখানোর কসরত।
একটা জায়গায় ভিড় দেখে এগিয়ে যাই। হ্যালোইনের সাজে বেশ কয়েকজন তরুণ–তরুণী। তাঁদের ঘিরে অনেকেই ছবি তুলছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, হ্যালোইনের সাজে সাধারণত ভূতপ্রেত কিংবা অশরীরী সাজে সাজা হয়। টরন্টোয় আমরা তা–ই দেখে এসেছি এত বছর ধরে। কিন্তু এরা সেজেছে সব ডিজিটাল চরিত্র। স্পাইডার ম্যান, সুপারম্যান, রোবট আরও কী কী যেন। এরা কি তাহলে হ্যালোইনের ডিজিলাইজেশন করে ফেলল!
নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড আর ডা. আসমা আহমদের গল্পছবি তোলো, ভিডিও করো—সেরীন পাশ থেকে তাগাদা দেয়। আমি সেলফোনে ছবি তুলতে চাইলে হ্যালোইনের ডিজিটাল একটি চরিত্র দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। হাত দিয়ে আড়াল তৈরি করে বলে, ‘দিস ইজ আওয়ার বিজনেস, ফটো উইথ পেমেন্ট অনলি।’
আমি সরি বলে হাত নামিয়ে ফেলি। তাকিয়ে দেখি, লাইন ধরে অনেকেই এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে ছবি তুলছেন।
‘বেস্ট অব লাক উইথ ইউর বিজনসে’, বলে সামনে এগোতে থাকি। আমাদের সাবওয়ে স্টেশন খুঁজতে হবে। জ্যাকসন হাইটস স্টেশনে আনোয়ার শাহাদাত অপেক্ষায় থাকবেন যে! চলবে...
জ্যাকসন হাইটস: আমেরিকায় বাংলাদেশ কিংবা নিউইয়র্কের ঢাকা!