বিএনপির অবস্থান গণভোটের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী

· Prothom Alo

বাংলাদেশের রাজনীতির এই পর্যায়ে এসে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে আমাদের সংকটের কেন্দ্রবিন্দু সংবিধান। গণ-অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, সেটাকে কীভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে স্থিতিশীল ও টেকসই রূপ দেওয়া যায়, সেই প্রশ্নটাই এখন প্রধান বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

Visit cat-cross.com for more information.

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা দেখছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের দলীয় অবস্থান ও কৌশলগত স্বার্থের আলোকে সংবিধানকে ব্যাখ্যা করছে। ফলে মৌলিক ঐকমত্যের বদলে বিভাজনই বেশি প্রকট হয়ে উঠছে।

বিএনপি শুরু থেকেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের ধারাবাহিকতার মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখতে চেয়েছে। তাদের বিশ্লেষণে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো অপরিহার্য। তারা মনে করে, রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখতে হলে নির্বাহী ক্ষমতা দুর্বল করা যাবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে একটি আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চিন্তা কাজ করে।

গণভোটের আগে বা পরে সংস্কার, সনদকে আগে আইনে পরিণত করা ইত্যাদি প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে তারা আলোচনাকে জটিল করেছে। এ ছাড়া একাডেমিক মহলের একটি অংশ বিষয়টিকে তাত্ত্বিক ও নীতিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করেছে। ফলে চারটি আলাদা ধারায় সংবিধান বিশ্লেষণের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আমরা চেষ্টা করেছিলাম একটি সমন্বিত পথ খুঁজে বের করতে। সংবিধানের ক্ষমতাকাঠামো অংশের সংস্কার প্রয়োজন। এর পেছনে একাডেমিক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক যুক্তি রয়েছে। কিন্তু আমরা চেয়েছি বিতর্কিত দার্শনিক প্রশ্নগুলো আপাতত পাশে রেখে একটি কমন মিনিমাম গোল নির্ধারণ করতে, যাতে ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কার নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য তৈরি হয়। লক্ষ্য ছিল, এমন একটি কাঠামো দাঁড় করানো, যা স্থিতিশীল ও টেকসই হবে এবং ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংকটের পুনরাবৃত্তি রোধ করবে।

সংসদের প্রথম দিনেই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শপথ ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান একটি প্রতীকী বিষয়। এ ঘটনাটি বড় বাধা নয়, কিন্তু একটি সতর্কবার্তা। এত বড় পরিবর্তনের পর যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিফলে যেতে পারে।

দুঃখজনকভাবে কমিশন মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সীমিত আলোচনায় নিজেদের আবদ্ধ রেখেছে। জনগণের বৃহৎ অংশকে সরাসরি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। এতে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে সংবিধান সংস্কারের একমাত্র কর্তৃত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর হাতেই। বড় দলগুলো নিজেদের স্বার্থ ও কৌশল অনুযায়ী অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি ’৭২ সালের সংবিধানের কাঠামোকে যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি শুরুতে সম্পূর্ণ নতুন সংবিধানের দাবি তুললেও পরে বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করেছে।

সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল পদ্ধতিগত বিষয়ের আলোচনায়। সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রশ্নটি শুরুতেই গুরুত্ব পায়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বারবার কমিশনকে বলেছি যে পদ্ধতির প্রশ্নটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। বাস্তবায়ন কাঠামো স্পষ্ট না থাকলে প্রস্তাব কাগজেই থেকে যাবে। পরে যখন বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠল, তখন আমরা সংস্কার পরিষদের প্রস্তাব দিয়েছি।

জুলাই সনদ যেন ব্যর্থ না হয়

গণভোট ও নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়াকে বিলম্বিত করার মাধ্যমে বিএনপি শুরুতেই অভ্যুত্থান এবং গণভোটের আকাঙ্ক্ষা পরিপন্থী অবস্থান নিল। এটা দুঃখজনক। বিএনপি এখন বলছে, তারা তাদের নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী এগোবে।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে। জনগণ একই সঙ্গে তাদের প্রতিনিধিত্বশীল ম্যান্ডেট দিয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে সরাসরি মতামতও জানিয়েছে। গণভোট সরাসরি জনগণের অভিব্যক্তি। গণতান্ত্রিক তত্ত্ব অনুযায়ী সরাসরি অভিব্যক্তির গুরুত্ব কম নয়। অতএব নোট অব ডিসেন্টের যেসব আপত্তি নীতিগত নয়, বরং পদ্ধতিগত বা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

সংবিধান সংস্কার পরিষদে বসে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৮০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য ছিল, এই সরকারের আমলেই জনগণ সংস্কারের সুফল পাবে এবং পরবর্তী নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও স্বাধীন ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। যদি সরকার সত্যিই জনগণের স্বার্থে কাজ করতে চায়, তাহলে এই সময়সীমাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সংসদের প্রথম দিনেই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শপথ ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান একটি প্রতীকী বিষয়। এ ঘটনাটি বড় বাধা নয়, কিন্তু একটি সতর্কবার্তা। এত বড় পরিবর্তনের পর যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিফলে যেতে পারে। অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বিভাজন থেকে বেরিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ। সেই দায়িত্ব এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাঁধে সবচেয়ে বেশি।

  • হাসনাত কাইয়ূম রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source